চট্টগ্রাম বন্দরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৮.৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হচ্ছে। এ জন্য সোমবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে চুক্তিতে সই করেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে আলম। বন্দর বলছে, এতে ২০ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হবে। প্রকল্পটি বন্দরের গ্রিন পোর্ট উদ্যোগের অংশ।
চুক্তির সবচেয়ে বড় দিক হলো, এখানে বন্দরকে নিজের টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। প্রকল্পটি চলবে অপারেটিং এক্সপেন্স বা ওপেক্স মডেলে। পুরো বিনিয়োগ করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। নকশা তৈরি, যন্ত্রপাতি কেনা, নির্মাণ, পরীক্ষা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর দিন থেকে ২০ বছর তারা বন্দরকে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তিতে নির্ধারিত দামে সেই বিদ্যুৎ কিনবে। বন্দরের দৈনন্দিন বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ এই উৎস থেকেই মেটানো হবে। সৌর প্যানেল বসবে বন্দরের স্থাপনার ছাদে। ফলে নতুন জমির দরকার হচ্ছে না। মাটিতে বন্দরের জায়গা যেমন ছিল তেমনই থাকবে, কাজেও বাধা পড়বে না। বন্দরের মতো ব্যস্ত ও জায়গার টানাটানির স্থাপনায় এটি বড় সুবিধা। বিনিয়োগ ও ঝুঁকি দুটোই বেসরকারি অংশীদারের কাঁধে থাকায় বন্দরের বাজেটেও কোনো চাপ পড়ছে না।
বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বন্দরের বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, এতে বন্দরের জন্য বিদ্যুতের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে। জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্যোগটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি নীতির সঙ্গে মিল রেখে নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য পূরণেও এটি ভূমিকা রাখবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের বড় অংশই এই বন্দর দিয়ে ওঠানামা করে। দিনরাত চলা ক্রেন, আলো, অফিস আর গুদামের জন্য বন্দরের বিদ্যুতের চাহিদা বিপুল। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করলে সেই চাপ সরাসরি বিদ্যুতের খরচে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির বাজার এখন অস্থির। এমন সময়ে ছাদের খালি জায়গা কাজে লাগিয়ে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া বন্দরের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান। লোডশেডিংয়ের সময়েও এই উৎস কিছুটা ভরসা দিতে পারে। বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিদ্যুৎ বিঘ্নিত হলে পণ্য খালাসেও দেরি হয়, তাই বিকল্প উৎসের মূল্য অনেক।
চট্টগ্রাম বন্দরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি উদাহরণ হতে পারে। দেশের অনেক সরকারি ভবন, কারখানা ও গুদামের ছাদ এখনো খালি পড়ে আছে। বিনিয়োগ ছাড়াই বেসরকারি অংশীদারের মাধ্যমে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ বসানো গেলে সরকারের বিদ্যুৎ বিল কমবে, গ্রিডের ওপর চাপও কমবে। তবে এই মডেলের সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো নির্মাণ শেষ হওয়া আর চুক্তির শর্ত ঠিকভাবে মানার ওপর। চট্টগ্রাম বন্দরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কবে শুরু হবে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।












