কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শত শত কৃষক। আমন ধানের শিষ বের হওয়ার পর এবং ধান পাকার ঠিক আগমুহূর্তে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধা পাকা ধান কেটে নিচ্ছেন। জমি রক্ষা করতে না পেরে অন্তত কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তাঁরা এসব ধান গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।
চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও মধ্যপাড়া এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো জমিতে ধানের শিষ মাত্র বের হতে শুরু করেছে, আবার কোথাও আধা পাকা ধানের দানা সোনালি রং ধারণ করছে। আর কয়েক দিন পরই ধান কাটার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষকদের স্বপ্নের ফসল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত দুই দিনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ওই এলাকাগুলোর অন্তত ১০ একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। নতুন করে আরও ২০০ থেকে ২৫০ বিঘা জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে চলতি মৌসুমের আমন ধানের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে জমিও হারানোর আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
ভাঙনকবলিত সুখেরবাতি এলাকার কৃষক জেলহক জানান, গত দুই দিন ধরে হঠাৎ করেই নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। তাঁর প্রায় দেড় একর জমি ইতিমধ্যে নদীতে চলে গেছে।
জেলহকের ভাষ্য, ধানে শিষ আসতে শুরু করার সময়ই ভাঙন দেখা দেয়। জমি রক্ষার কোনো উপায় না থাকায় এখন আধা পাকা ধান কেটে নিচ্ছেন তিনি। এতে অন্তত গবাদিপশুর খাবারের ব্যবস্থা হবে বলে আশা করছেন এই কৃষক।
একই এলাকার কৃষক নগর আলী ও সাবুর নায়া জানান, ধানের চারা কেনার জন্য তাঁরা ঋণ নিয়েছেন। সার, কীটনাশক ও সেচের জ্বালানি কিনতেও ব্যয় করেছেন অনেক টাকা। ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সারা বছরের পারিবারিক খরচ মেটানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু নদীভাঙনে সেই আশা ভেঙে পড়েছে। আগামী দিনে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়েই এখন তাঁদের দুশ্চিন্তা।
স্থানীয়দের দাবি, গত এক বছরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে শত শত একর ফসলি জমি ও শতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। চর শৌলমারী ইউনিয়নের চরিপাড়া, বয়াতিপাড়া, শেখের বাজার এবং চর খেদাইমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকাও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভাঙনের শিকার তন্ময় হাসান টোটা জানান, গত এক বছরেই তাঁর পরিবারের প্রায় ৪০ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। সুখেরবাতি ও মধ্যপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, পাশের চর খেদাইমারী এলাকায় বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের এলাকার সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে একের পর এক জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান জানান, গত দুই দিন ধরে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনে ইউনিয়নের ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সীমিতসংখ্যক বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু নদীর প্রবল স্রোতে সেগুলোও দ্রুত ভেসে যাচ্ছে। ফলে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে চরাঞ্চলে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, বরাদ্দ না থাকায় বর্তমানে চরাঞ্চলে সুরক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় মূল নদীতীর রক্ষাকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
নদীভাঙনে জমি হারানো কৃষকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু চলতি মৌসুমের ফসল নয়, তাঁদের জীবিকার ভবিষ্যৎও। ধান ঘরে তোলার আগেই জমি নদীতে হারিয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ, পরিবারের ভরণপোষণ এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।












