ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নভেম্বরের শুরুতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনা করছে বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)। আগামী ১ নভেম্বর নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশের পর আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এরই মধ্যে আন্দোলনের ধরন ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে জোটের নেতাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় ধারাবাহিক মিছিলের পর বিরোধী নেতারা নতুন কর্মসূচির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, আন্দোলনের গতি ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি জানিয়েছেন, পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে একাধিক প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। দিল্লির কেন্দ্রস্থলে আগের মিছিলগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে কেউ কেউ একই ধরনের বড় সমাবেশ আবার আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্য একটি প্রস্তাবে জ্ঞানেশ কুমারের অভিশংসনের দাবিকে সামনে রেখে প্রতীকী সংসদ অধিবেশন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।
বেবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতীকী অধিবেশনে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতিদের আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। সেখানে কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে একটি কাল্পনিক বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে। তাঁর পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার জন্যও কাউকে রাখা হবে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরতে চায় জোট।
কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ নেতাও জানিয়েছেন, এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যায়ে পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লিতে বড় ধরনের মিছিল করে বিরোধী দলগুলো। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন দলের কর্মী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সাম্প্রতিক সময়ে কুমারের বিরুদ্ধে এটিকে অন্যতম বড় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে বিরোধীদের রাজনৈতিক বিরোধও আরও তীব্র হয়েছে।
গত ৯ অক্টোবর বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ২০২৩ সালের সেই আইন বাতিলের দাবি জানান, যে আইনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিস্তৃত আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।
এ ছাড়া ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) অবিলম্বে স্থগিত করা এবং ভোটার তালিকা থেকে বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম পুনর্বহালের দাবিও জানান তাঁরা।
জবাবে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বিরোধীদের কাছে ভোট চুরির অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ১২ অক্টোবর রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী নেতারা সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিল করেন। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে আদালতে আবেদন জমা দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য। মিছিলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ বিরোধী জোটের বিভিন্ন নেতা অংশ নেন।
আবেদনে রাহুল গান্ধী, খাড়গে ও অন্য নেতারা অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত ক্ষমতা একতরফা ও স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রয়োগ করেছেন। তাঁদের দাবি, সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা রক্ষায় নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।
আবেদনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া ও ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে বিরোধী নেতারা আবেদনে স্পষ্ট করেছেন, তাঁরা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াটির বৈধতা নিয়ে সামগ্রিক বিতর্ক নতুন করে শুরু করার দাবি জানাচ্ছেন না। বরং ওই প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর পর্যালোচনা চান।
রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে প্রস্তুতি
আগামী ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানের সমাবেশকে সামনে রেখে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো প্রস্তুতি শুরু করেছে। নবরাত্রি ও দুর্গাপূজার কারণে আগের আন্দোলনে যে বিরতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে কীভাবে আবার জনসমর্থন জোরদার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিরোধী জোটের এক নেতা জানিয়েছেন, পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নেওয়া হবে। কোনো একটি দল এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেবে না। আন্দোলনের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের জন্য জোটের শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটারদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ এবং জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকার প্রতিবাদে আয়োজিত আসন্ন সমাবেশে শিক্ষার্থী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনও অংশ নেবে।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে চায় বিরোধী জোট। তবে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নভেম্বরের শুরুতে রামলীলা ময়দানের সমাবেশের পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।












