কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংগীত তৈরির প্রক্রিয়াকে সহজ করে তুললেও সৃজনশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ব্রিটিশ ইলেকট্রনিক সংগীত জুটি চেজ অ্যান্ড স্ট্যাটাসের মতে, এআইয়ের কারণে সংগীতশিল্পীদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাঁদের কাজের মান কমে যাওয়া নয়, বরং সহজে তৈরি করা যায় এমন গতানুগতিক সংগীতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। তাঁদের বিশ্বাস, প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, শিল্পীর নিজস্বতা, মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীল দৃঢ়তার মূল্যও তত বাড়বে।
জুটি দুটির সদস্য সল মিল্টন, যিনি চেজ নামে পরিচিত, এবং উইল কেনার্ড, যিনি স্ট্যাটাস নামে পরিচিত, সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংগীতজগতে সক্রিয় এই জুটির স্পটিফাইয়ে গান শোনার সংখ্যা দুই বিলিয়নের বেশি। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত তাঁদের নতুন অ্যালবাম ‘জেনেরিক এভরিথিং’-এর কেন্দ্রীয় ভাবনাও প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংগীতের স্বকীয়তা ঘিরে।
গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে নতুন অ্যালবাম
কেনার্ড জানান, নতুন অ্যালবাম তৈরির সময় প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং এআইয়ের বিস্তার তাঁদের মধ্যে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। অন্য শিল্পী ও বন্ধুদের মধ্যেও তাঁরা একই ধরনের উদ্বেগ দেখেছেন।
তাঁদের আশঙ্কা ছিল, জনপ্রিয় প্রবণতা অনুসরণ করতে গিয়ে শিল্পীরা নিজেদের সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলছেন। এমনকি নিজেদের কাজেও তাঁরা গতানুগতিকতার ছাপ দেখতে পান। সেখান থেকেই ‘জেনেরিক এভরিথিং’ নামটির জন্ম। স্টুডিওর একটি বোর্ডে লেখা এই বাক্যটি তাঁদের জন্য হয়ে ওঠে সহজ পথ এড়িয়ে নতুন কিছু করার স্মারক।
অ্যালবামের সংগীতধারাতেও এসেছে পরিবর্তন। মিল্টন জানান, শুরুতে তাঁরা যে ধরনের অ্যালবাম তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন, কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে আসেন। নতুন শব্দ, ভিন্ন সংগীতায়োজন এবং পরীক্ষামূলক ভাবনা তাঁদের সৃষ্টির ধরন বদলে দেয়।
কেনার্ডের মতে, ‘ডিসগ্রান্টলড’ গানটি তাঁদের নতুন দিকটি স্পষ্ট করে। গিটারনির্ভর, পাঙ্কধর্মী এবং সরাসরি পরিবেশনার আবহের এই গান তাঁদের পরবর্তী কাজেও ভিন্ন পথে এগোনোর সাহস জুগিয়েছে। ‘টেনশন’ গানেও সেই পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে।
এআইয়ের ভয় নয়, আত্মতুষ্টিই বড় ঝুঁকি
এআই সংগীতশিল্পীদের কাজ দখল করে নেবে—এমন আশঙ্কাকে বড় করে দেখতে চান না মিল্টন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা শিল্পীদের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি করতে পারে। কয়েকটি নির্দেশ লিখেই যখন নতুন সংগীত তৈরি করা সম্ভব, তখন সৃষ্টির পেছনে সময়, শ্রম ও নিজস্ব চিন্তা বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সংগীতশিল্পীরা আগেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছেন। ভিনাইল রেকর্ড ও সিডি থেকে ডিজিটাল ডাউনলোড, পরে স্ট্রিমিং—প্রতিটি পরিবর্তনকেই একসময় বড় সংকট বলে মনে হয়েছিল। একইভাবে স্যাম্পলার, সিনথেসাইজার ও মিক্সিং ডেস্কের ব্যবহার থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরের শুরুতেও সংগীতের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে শিল্পীরা নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছেন এবং উন্নত মানের সংগীত তৈরি করেছেন।
মিল্টনের ধারণা, এআইয়ের ক্ষেত্রেও এমন একটি অভিযোজনপর্ব চলছে। প্রযুক্তি আরও উন্নত হতে পারে, কিন্তু সেটিকে কীভাবে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলিক চিন্তা ও দৃঢ়তাই শিল্পীর পরিচয়
এআইয়ের পক্ষে নতুন ধারণা সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন করা সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে মিল্টনের বক্তব্য, এআই মূলত আগে থেকে থাকা ধারণাগুলোকে নতুনভাবে সাজায়। সংগীতকে পরিশীলিত করা সম্ভব হলেও প্রচলিত চিন্তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তার সীমিত।
তাঁর মতে, শিল্পীর স্বকীয়তা তৈরি হয় নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ভবিষ্যতে এআই আরও শক্তিশালী হলে শিল্পীদের সবচেয়ে মূল্যবান গুণ হবে নিজেদের সৃষ্টির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। অন্য সবাই যখন একই দিকে এগোবে, তখন ভিন্ন পথে যাওয়ার সাহস দেখাতে হবে।
চেজ অ্যান্ড স্ট্যাটাসের কাছে সংগীত শুধু প্রযুক্তি বা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা নয়। তাঁদের মতে, ড্রাম অ্যান্ড বেজ সংগীতের অন্যতম শক্তি হলো ঐক্য—বর্ণ, ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের পার্থক্য অতিক্রম করে মানুষকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা।
নতুন অ্যালবামের মাধ্যমে তাঁরা শ্রোতাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো অ্যালবাম শোনার অভ্যাসেও ফিরিয়ে আনতে চান। তাঁদের কাছে গানের ক্রম ও একটির পর আরেকটির মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা অ্যালবামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনপ্রিয় প্রবণতা অনুসরণ নয়, বরং নতুন কিছু পরীক্ষা করা এবং নিজেদের সীমা অতিক্রম করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
এআইয়ের যুগে সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট: প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু সৃজনশীলতার দায়িত্ব এড়ানো যাবে না।












