তিতাস একটি নদীর নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখা বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উপন্যাস (ইংরেজিতে A River Called Titas)। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর পাড়ের মালো জেলেদের জীবন, গান, উৎসব আর নদী শুকিয়ে যাওয়ার কষ্ট ধরা পড়েছে। বইটি ১৯৫৬ সালে ছাপা হয়, লেখকের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর।
এক নজরে
- বই: তিতাস একটি নদীর নাম (উপন্যাস)
- লেখক: অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪ থেকে ১৯৫১)
- বই আকারে প্রকাশ: ১৯৫৬ সাল, লেখকের মৃত্যুর পর
- পটভূমি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী আর মালো জেলে সমাজ
- চলচ্চিত্র: ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় ১৯৭৩ সালে
- ইংরেজি অনুবাদ: A River Called Titas, অনুবাদক কল্পনা বর্ধন
তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের কাহিনি কী
উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে তিতাস নদী আর তার পাড়ের মালো জেলেরা। মালোরা নদী থেকে মাছ ধরে সংসার চালায়। নদীর জলকে ঘিরেই তাদের উৎসব, গান আর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বইটিতে দেখা যায়, নদী ভরা থাকলে জেলেদের ঘরে অন্ন থাকে, গাঁয়ে প্রাণ থাকে। কিন্তু নদী যখন শুকিয়ে আসতে থাকে, তখন জেলেদের জীবিকা আর পুরো সমাজই ভেঙে পড়তে শুরু করে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের পরিচিতি অনুযায়ী বইটি এমন এক সমাজের গল্প, যার গান, ভাষা, রীতিনীতি আর ছন্দ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আধুনিকতা আর রাজনৈতিক সংঘাতে হারিয়ে যায়। সেখানে হিন্দু জেলে আর মুসলমান কৃষকেরা পাশাপাশি শান্তিতে বাস করে।
এই কারণে অনেকে তিতাস একটি নদীর নাম বইটিকে শুধু একটি নদীর গল্প বলেন না। এটি একটি জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার, হারিয়ে যাওয়ার আর স্মৃতি ধরে রাখার গল্প।
বইটি পড়তে পড়তে কয়েকটি প্রশ্ন মনে আসে। প্রকৃতি বদলালে মানুষ কী করবে? পুরোনো পেশা টিকে না থাকলে নতুন জীবিকা কোথায় মিলবে? এই প্রশ্নগুলো বহু বছর পরেও পাঠককে ভাবায়।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ কে ছিলেন
অদ্বৈত মল্লবর্মণ (Adwaita Mallabarman) ১৯১৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ গ্রামে জন্মেছিলেন। তিনি নিজেও জেলে পরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান। গাঁয়ের জেলেরা তাঁকে স্কুলে পড়তে সাহায্য করেছিলেন।
১৯৩৩ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও পড়া শেষ করেননি। ১৯৩৪ সালে তিনি কলকাতায় চলে যান।
কলকাতায় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৪৫ সালে একটি নামী সাহিত্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল যক্ষ্মা রোগে তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৭ বছর।
মালো সম্প্রদায় কারা
মালো হলো মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল একটি জেলে সম্প্রদায়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় গ্রামটি এই সম্প্রদায়ের। নদী ছিল তাদের রুটি-রুজি, আবার নদীই ছিল গান আর উৎসবের জায়গা।
লেখক নিজে এই সমাজের মানুষ ছিলেন। তাই মালোদের গল্প, নীতিবোধ আর সৌন্দর্যচেতনা বইটিকে আলাদা রূপ দিয়েছে। পাঠক পড়তে পড়তে যেন তিতাসের পাড়ের কোনো উঠানে এসে বসেন।
জেলেদের জীবন সহজ ছিল না। মাছ ধরা নির্ভর করে নদীর পানি, আবহাওয়া আর মৌসুমের ওপর। এক মৌসুমে ভালো মাছ পড়লে সংসার চলে, না পড়লে অভাব নেমে আসে। এই অনিশ্চয়তা জেলে সমাজের জীবনের একটি বড় সত্য।
উপন্যাস, সিনেমা আর অনুবাদের ইতিহাস
উপন্যাসের কিছু অংশ আগে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। পুরো বই হিসেবে এটি বের হয় ১৯৫৬ সালে। তখন লেখক বেঁচে ছিলেন না।
১৯৭৩ সালে একই নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন ঋত্বিক ঘটক। যাঁরা বই হাতে পাননি, তাঁরা ছবিটি দেখেও নদী আর জেলে সমাজের জীবনের একটি ধারণা পেতে পারেন। ইংরেজিতে বইটির নাম A River Called Titas। অনুবাদ করেছেন কল্পনা বর্ধন, আর এটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস।
তিতাস নদী এখন কেমন আছে
তিতাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রধান নদী। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এটি ভারতের ত্রিপুরার পাহাড় থেকে নেমে আখাউড়া দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এরপর আশুগঞ্জের দক্ষিণে মেঘনায় মিশে যায়। নদীর উৎস, গতিপথ আর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমাদের তিতাস নদীর পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি লেখায়।
উপন্যাসে শুকিয়ে যাওয়া নদীর যে ছবি আছে, বাস্তবে তার ছায়া আজও দেখা যায়। ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে স্থানীয় মানুষ আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানায়, পলি জমে আর খনন না হওয়ায় নদী মরে যাওয়ার পথে। ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নদী সরু খালের মতো হয়ে গেছে, তীরে প্রভাবশালীদের দালানকোঠা উঠেছে।
দুই সময়ের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, নদীতে মাছ আগের চেয়ে কমে গেছে। অর্থাৎ উপন্যাসের জেলে সমাজের সংকট আজকের জেলেদেরও সংকট।
নদী বাঁচাতে খনন, দখল উচ্ছেদ আর দূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা অনেক দিন ধরে শোনা যায়। এসব কাজ কতটা হলো, তা নদীর পাড়ের মানুষই সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন। উপন্যাসটি সেই মানুষগুলোর কণ্ঠ মনে রাখতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে এই উপন্যাসের গুরুত্ব কী
লেখকের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, বইয়ের নদীও আমাদের নিজের দেশের নদী। তাই এটি আমাদের মাটির গল্প। দেশের গ্রামীণ জীবন আর নদীনির্ভর সংস্কৃতির নিবিড় ছবি এখানে ধরা পড়েছে।
বইটি মনে করিয়ে দেয়, নদী মরে গেলে শুধু পানি যায় না। একটি গোটা সমাজ, তার গান আর পেশাও হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের অনেক নদী আজ পলি, দখল আর দূষণে কষ্টে আছে। তাই বইটি পুরোনো হয়েও আজকের কথা বলে।
শিক্ষার্থীরা তিতাস একটি নদীর নাম পড়লে একসঙ্গে সাহিত্য, ইতিহাস আর পরিবেশের পাঠ পেতে পারে। যাঁরা সরাসরি বই হাতে পাননি, তাঁরা অন্তত ছবিটি দেখে কিংবা সারসংক্ষেপ পড়ে গল্পের ধারণা নিতে পারেন।
নদী নিয়ে আরও জানতে চাইলে পড়তে পারেন আমাদের নদ ও নদীর পার্থক্য নিয়ে লেখা। সেখানে ব্রহ্মপুত্র আর পদ্মার উদাহরণে সহজ ব্যাখ্যা আছে।
বইটি কীভাবে পড়বেন
প্রথমবার বইটি পড়তে বসলে ভাষা দেখে একটু থমকে যেতে পারেন। ধীরে পড়লে অর্থ আপনিই বুঝে আসে, আর গল্পের সুরও ধরা পড়ে। শব্দ বুঝতে অসুবিধা হলে পাশে একটি খাতা রেখে নতুন শব্দগুলো লিখে রাখা যায়।
পড়ার সময় তিনটি জিনিস খেয়াল করতে পারেন। প্রথমটি নদীর অবস্থা, যা বদলালে মানুষের জীবনও বদলায়। দ্বিতীয়টি মালোদের গান ও উৎসব, যা তাদের পরিচয়ের অংশ। তৃতীয়টি গাঁয়ের হিন্দু আর মুসলমান মানুষের পাশাপাশি থাকার ছবি।
একদিনে শেষ করার তাড়া না করে অল্প অল্প করে পড়াই ভালো। শিক্ষার্থীরা চাইলে প্রতিটি অধ্যায়ের পর নিজের ভাষায় কয়েক লাইন সারসংক্ষেপ লিখে রাখতে পারেন। এতে গল্প মনে থাকে, পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও কাজে লাগে।
সাধারণ প্রশ্ন
তিতাস একটি নদীর নাম কে লিখেছেন?
উপন্যাসটি লিখেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বইটি তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয়।
তিতাস একটি নদীর নাম কোন নদীকে নিয়ে লেখা?
এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী আর তার পাড়ের মালো জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা।
এই উপন্যাস নিয়ে কি সিনেমা হয়েছে?
হ্যাঁ। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক একই নামে সিনেমা বানিয়েছেন।
ইংরেজিতে বইটির নাম কী?
ইংরেজিতে নাম A River Called Titas। অনুবাদক কল্পনা বর্ধন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬












