শরীরে আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, তা বোঝার জন্য চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এসব পরীক্ষার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ফেরিটিন। শরীরে আয়রন সঞ্চিত রাখার কাজে ফেরিটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্তে ফেরিটিনের মাত্রা কমে যাওয়া অনেক সময় শরীরে আয়রনের মজুত কমে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এমনকি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও ফেরিটিন কম থাকতে পারে।
ফেরিটিন ও আয়রন এক বিষয় নয়। আয়রন শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে, বিশেষ করে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে। অন্যদিকে, ফেরিটিন হলো এমন একটি প্রোটিন, যা শরীরে আয়রন জমা করে রাখে। সহজভাবে বললে, ফেরিটিনকে শরীরের আয়রনের সঞ্চয়ভান্ডার হিসেবে ভাবা যায়।
ফেরিটিনের মাত্রা কমে গেলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, শীত বেশি অনুভব করা কিংবা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে আয়রনের ঘাটতি নির্ণয় করা ঠিক নয়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
খাবারের মাধ্যমে কি ফেরিটিন বাড়ানো সম্ভব?
হ্যাঁ, নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরে আয়রনের মজুত বাড়াতে সাহায্য হতে পারে। তবে এর ফল পেতে সময় লাগে। এক-দুই দিন বেশি আয়রনযুক্ত খাবার খেলেই ফেরিটিনের মাত্রা বেড়ে যাবে, এমন নয়। নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া এবং শরীর যাতে খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন শোষণ করতে পারে, সেদিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টিবিদদের মতে, যাঁদের ফেরিটিন কম, তাঁরা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তত একটি আয়রনসমৃদ্ধ প্রধান খাবার রাখতে পারেন। তবে ঘাটতির মাত্রা, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং এর পেছনের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
ফেরিটিন বাড়াতে সহায়ক ১১টি খাবার
খাবারে দুই ধরনের আয়রন পাওয়া যায়—হিম আয়রন ও নন-হিম আয়রন। হিম আয়রন মূলত প্রাণিজ খাবারে থাকে এবং শরীর সাধারণত এটি তুলনামূলক সহজে শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে, উদ্ভিজ্জ খাবার ও আয়রনসমৃদ্ধ কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে নন-হিম আয়রন পাওয়া যায়। এটি শোষণে কিছুটা বেশি বাধা থাকতে পারে। তবে সঠিকভাবে খাবার নির্বাচন করলে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকেও আয়রন পাওয়া সম্ভব।
১. গরুর মাংস: গরুর মাংসে হিম আয়রন থাকে, যা শরীরে তুলনামূলক সহজে শোষিত হয়। পরিমিত পরিমাণে গরুর মাংস খেলে আয়রনের চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে।
২. মুরগির মাংস: মুরগির মাংসও প্রাণিজ আয়রনের একটি উৎস। সুষম খাদ্যতালিকায় এটি রাখা যেতে পারে।
৩. শূকরের মাংস: শূকরের মাংসে আয়রন থাকে এবং এটি শরীরের আয়রনের জোগান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
৪. সামুদ্রিক খাবার: মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাবারের কিছু ধরন আয়রনের ভালো উৎস। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় উপযুক্ত সামুদ্রিক খাবার রাখলে আয়রন গ্রহণ বাড়তে পারে।
৫. আয়রনসমৃদ্ধ সিরিয়াল: কিছু প্রাতরাশের সিরিয়ালে অতিরিক্ত আয়রন যোগ করা হয়। প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য দেখে আয়রনের পরিমাণ যাচাই করে এগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে।
৬. আয়রনসমৃদ্ধ গমের সিরিয়াল: গম থেকে তৈরি কিছু প্রাতরাশের খাবারেও আয়রন যোগ করা হয়। এগুলো দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আয়রনের পরিমাণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
৭. মোলাসেস: আখ বা চিনিবীজজাতীয় কিছু উৎস থেকে তৈরি ঘন মিষ্টি সিরাপে আয়রন থাকতে পারে। তবে এতে চিনিও থাকে, তাই এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
৮. শিম ও অন্যান্য বিচিজাতীয় খাবার: শিমজাতীয় খাবার উদ্ভিজ্জ আয়রনের উৎস। এগুলো থেকে আয়রনের পাশাপাশি আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়।
৯. মসুর ডাল: মসুর ডালে নন-হিম আয়রন থাকে। ভাত, শাকসবজি ও অন্যান্য সুষম খাবারের সঙ্গে ডাল খেলে দৈনিক আয়রন গ্রহণ বাড়ানো সম্ভব।
১০. পালংশাক: পালংশাকে উদ্ভিজ্জ আয়রন রয়েছে। তবে উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীর তুলনামূলক কম শোষণ করতে পারে। তাই পালংশাকের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রন শোষণে সহায়তা মিলতে পারে।
১১. টোফু: সয়াবিন থেকে তৈরি টোফু উদ্ভিজ্জ আয়রনের একটি উৎস। বিশেষ করে নিরামিষভোজীদের খাদ্যতালিকায় এটি উপকারী সংযোজন হতে পারে।
আয়রন শোষণ বাড়াতে ভিটামিন সি
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পাশাপাশি শরীর কতটা আয়রন শোষণ করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন সি সহায়তা করে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে টমেটো, কমলালেবু, স্ট্রবেরি কিংবা ক্যাপসিকামের মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।
আরেকটি উপায় হলো লোহার কড়াইয়ে রান্না করা। রান্নার সময় খাবারে কিছু পরিমাণ আয়রন যুক্ত হতে পারে। তবে এর পরিমাণ খাবারের ধরন, রান্নার সময় এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু লোহার কড়াইয়ে রান্নার ওপর নির্ভর করে আয়রনের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা উচিত নয়।
কোন খাবারগুলো খাওয়ার সময়ে সতর্ক থাকবেন?
ফেরিটিন বাড়াতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বরং আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অন্য খাবার বা পানীয় খাওয়ার সময়ের দিকে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
চা ও কফি: চা ও কফিতে থাকা পলিফেনল খাবার থেকে আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চা-কফি না খেয়ে অন্তত এক ঘণ্টা আগে বা পরে পান করা যেতে পারে।
ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ও সম্পূরক: ক্যালসিয়াম কিছু পরিস্থিতিতে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। তাই আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও আয়রনের সম্পূরক আলাদা সময়ে গ্রহণ করা যেতে পারে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত দুধ খাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা ভালো।
গমের ভুসি, শস্য ও ডালজাতীয় খাবার: এসব খাবারে থাকা ফাইটেট আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তবে এগুলো পুষ্টিকর খাবার এবং পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শস্য ও ডাল ভিজিয়ে রাখা, উপযুক্তভাবে রান্না করা কিংবা গাঁজন করা খাবার বেছে নেওয়া কিছু ক্ষেত্রে ফাইটেটের প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ডিম: ডিমে থাকা কিছু উপাদান আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ডিম পুষ্টিকর খাবার এবং এটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আয়রনের ঘাটতি থাকলে খাবারের সমন্বয় ও সময় নিয়ে পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
লাল ওয়াইন: লাল ওয়াইনে থাকা পলিফেনল আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তবে ফেরিটিন বাড়ানোর জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের খাদ্যনিষেধ প্রযোজ্য নয়। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
খাবারের মাধ্যমে আয়রন গ্রহণ বাড়ানো উপকারী হলেও সব ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। ফেরিটিন কমে যাওয়ার পেছনে অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ, পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ, খাবার থেকে আয়রন শোষণে সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন ক্লান্তি, দুর্বলতা বা চুল পড়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানো ভালো। আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত হলে চিকিৎসক প্রয়োজনে আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন এবং ঘাটতির কারণ খুঁজে দেখবেন। নিজের সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়, কারণ শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমাও ক্ষতিকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফেরিটিন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে সেগুলোর সমন্বয় করা এবং আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে এমন খাবার ও পানীয়ের সময় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিক চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাস নির্ভর করবে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং আয়রনের ঘাটতির কারণের ওপর।












