কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে দুই তরুণকে পাচারের অভিযোগে ঢাকায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাওন মোল্লা ও সাকিব সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডি জানিয়েছে, ভুক্তভোগীরা আগের দিন সোমবার পল্টন থানায় মামলা করেন। সেই মামলার সূত্র ধরেই এই অভিযান। কম্বোডিয়ায় মানব পাচার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই গ্রেপ্তার নতুন করে বিষয়টি সামনে এনেছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি দুই তরুণকে বিদেশে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিল। এ জন্য প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। পরে মুক্তির জন্য পাচারকারীরা আরও ৫ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করে। তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে পরিবারগুলো সেই টাকাও পাঠায়। মুক্তির পরও দেশে ফেরার বিমান টিকিটের নামে আবার টাকা আদায় করা হয়।
ছাড়া পাওয়ার পর দুই তরুণ প্রায় দুই মাস কম্বোডিয়ার একটি হোটেলে আটকে ছিলেন। শেষে তাঁরা অনলাইনে ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সংস্থাটির সহায়তায় গত ৩ সেপ্টেম্বর তাঁরা দেশে ফেরেন। ফেরার পর তাঁরা আইনের আশ্রয় নেন। তাঁদের মামলার পরই সিআইডি অভিযানে নামে। অর্থাৎ ভুক্তভোগীরা মুখ খোলার পরই এই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটল। এই ঘটনা দেখায়, ফিরে আসা মানুষেরা অভিযোগ করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। অনেক ভুক্তভোগী লজ্জা বা ভয়ে চুপ থাকেন। ফলে পাচারকারীরা নতুন শিকার খোঁজার সুযোগ পায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে গড়ে ওঠা অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলো এখন বড় আন্তর্জাতিক সমস্যা। এসব কেন্দ্রে বিভিন্ন দেশের তরুণদের আটকে রেখে মানুষের সঙ্গে ভুয়া বিনিয়োগ বা প্রেমের ফাঁদ পেতে প্রতারণা করানো হয়। চাকরির আশায় যাওয়া অনেকে শুরুতে বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা পাচারের শিকার। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি দুই দিক থেকে উদ্বেগের। একদিকে দেশের বেকার তরুণেরা সহজেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। অন্যদিকে একটি চাকরির আশায় পরিবারগুলো বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে শেষে সর্বস্ব হারাচ্ছে। এই ঘটনাতেই দুই পরিবারকে চাকরির খরচ, মুক্তিপণ আর ফেরার ভাড়া, তিন দফায় টাকা গুনতে হয়েছে। কম্বোডিয়ায় মানব পাচার তাই শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি অনেক পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণও।
বিদেশে কাজের প্রস্তাব পেলে তাই আগে যাচাই করা জরুরি। সরকারি নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে না গেলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিদেশে কাজের জন্য জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো দালাল ভিসার কাগজ দেখিয়ে দ্রুত পাঠানোর কথা বললে সতর্ক হওয়া উচিত। পর্যটক ভিসায় চাকরির জন্য বিদেশে যাওয়াও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। যাওয়ার আগে পাসপোর্ট ও চুক্তিপত্রের কপি পরিবারের কাছে রেখে যাওয়া ভালো। বিপদে পড়লে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। এই মামলার বিচার কত দ্রুত হয়, সেদিকে নজর থাকবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর। কম্বোডিয়ায় মানব পাচার ঠেকাতে চক্রের মূল হোতাদের ধরাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












