আজ ইন্দিরা গান্ধীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী। একজন বাঙালি যেমন যে কোনো পরিস্থিতিতে বসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে তাঁকে স্মরণ করবে। পাশাপাশি স্মরণ করবে ভারতের মহীয়সী নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে।
তবে এবার পৃথিবীতে যখন ৩১ অক্টোবর আবার কালপরিক্রমায় ফিরে এসেছে, সে সময়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রগতিশীল মানুষকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে। নতুন করে ভাবতে হবে কোন যুদ্ধ তিনি পৃথিবীতে শুরু করেছিলেন। এবং যার কারণে তাঁকে নির্মমভাবে নিহত হতে হয়েছিল।
তাছাড়া যারা ইন্দিরা গান্ধীকে চর্চা করেন—তারা কমবেশি জানেন, মিসেস গান্ধ জানতেন, এই যুদ্ধ শুরু করার পরে হয়তো বুলেটের আঘাতে নিহত হবেন। তারপরও সেখান থেকে পিছিয়ে আসেননি।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ইন্দিরা গান্ধী একটি বিশেষ ধর্মের উপাসনালয়ে সামরিক অভিযান চালিয়ে—একটি ধর্মের ওপর আঘাত করেছিলেন বলে সেই ধর্মের মানুষেরা তাঁকে হত্যা করেছে। এই ধোঁয়াশাটার ভেতর বেশির ভাগ মানুষ শুধু নয়, একেবারে নিরীশ্বরবাদী খুশওয়ান্ত সিং অবধি আটকে গিয়েছিলেন। তিনিও মনে করেছিলেন এটি উপাসনালয়ের ওপর আঘাত। তাই এর প্রতিবাদে তাঁর মতো আধুনিক মানুষও রাষ্ট্রীয় পদক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সেদিন খুশওয়ান্ত সিংয়ের মতো মিসেস গান্ধীর সরকারের অনেকেরই একই ধারণা ছিল। যে কারণে সন্ত্রাসীরা সেদিন যে গোল্ডেন টেম্পলকে একটি অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিল, সেখানে অপারেশন চালানোর জন্য মিসেস গান্ধীকে অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করতে হয়েছিল।
মিসেস গান্ধীর এই কঠোরতা ও তাঁর নিজের জীবন উৎসর্গ করার ফলে ভারতবাসীর কী লাভ হয়েছে, তা ভারতকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে হয়তো একশ বছর লাগবে।
কিন্তু মিসেস গান্ধী ওই ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার আজ ৪১ বছর পরে—তাঁর মৃত্যুর ৪২তম বছরে এসে দেখা যাচ্ছে—তাঁর দেশের রাজনীতির একটি অংশ চলে গেছে উপাসনালয়ের মধ্যে। তাঁর প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, যে দেশের জন্মের সঙ্গে তিনি চিরকালের জন্য যুক্ত হয়ে আছেন, সেখানেও সরকার উৎখাতের মাধ্যমে মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার এক মেটিকুলাস ডিজাইনের আন্দোলনের পরে বোঝা যাচ্ছে, অনেক উপাসনালয় ছিল সশস্ত্রদের ঘাঁটি। তাঁর দেশের আর দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানেরও অনেক উপাসনালয় সশস্ত্র জঙ্গিদের ঘাঁটি।
১৯৮৪ সালে যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদীরা মিসেস গান্ধীকে হত্যা করে, তাদের সশস্ত্র অংশ যেমন উপাসনালয়ে ছিল—তেমনি আজ তাদের মগজেও ধীরে ধীরে এক ধরনের সশস্ত্র উন্মাদনার উপাসনালয় সৃষ্টি হয়েছে। এই যে কোনো ধর্মীয় উন্মাদনার এক একটি মানুষ নিজেই এক একটা সশস্ত্র উপাসনালয় হয়ে যাচ্ছে। এবং অনেক রাষ্ট্র, অনেক ক্ষমতালোভী এবং অন্ধত্বের ধারক-বাহকেরা তাদের চিন্তাকে, তাদের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ না বলে তারা একে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বলছে। এমনকি আজ অনেক রাষ্ট্রে এই ধর্মীয় উগ্রতাকে জাতীয়তাবাদের মোড়কে—কনসেপচুয়াল জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এবং এর পক্ষে তারা একটি শক্ত ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। যার বিপরীতে আজ অনেক দেশে প্রগতিশীলরা অনেকটা অসহায়।

ইন্দিরা গান্ধী যখন এই সশস্ত্র ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজে প্রাণ দিয়ে যান—সে সময়ে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদেরকে চিন্তায় ও আধুনিকতায় অগ্রসর দাবি করলেও তারাও এটা বুঝতে পারেনি। তারা মনে করেছিল, তৃতীয় বিশ্বের নেতারা তো এমনিভাবে মারা যায়।
আজ ইন্দিরা গান্ধীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে দেখা যাচ্ছে, ওই যে এক একটি মানুষ এক একটি সশস্ত্র উপাসনালয় হয়ে গেছে—তাদের আগুনে পুড়ছে ফ্রান্স, ইতালি, আলবেনিয়া এবং খুব শিগগিরই ইংল্যান্ড, নিউইয়র্কও পুড়তে পারে।
তাই এ মুহূর্তে পৃথিবীকে এই দেশ, মানুষ ও অর্থনীতি ধ্বংসকারী অন্ধ জঙ্গিদের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ইন্দিরা গান্ধী ওই সশস্ত্রদেরকে যেভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন—বা গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেছিলেন—ওই পথই গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি মৃত্যুকে উপেক্ষা করেও নিজেকে সেক্যুলারিজম ও আধুনিকতাকে ধারণ করতে হবে বোধের গভীর থেকে।
আর এ ধরনের যুদ্ধ কেন, কোনো যুদ্ধের জন্যই দীর্ঘ সময় নেওয়া উচিত নয়। পৃথিবীতে ভালোর জন্যও যেসব যুদ্ধ হয়েছে, তা যত দীর্ঘ হয়েছে ততই তা দিগ্ভ্রান্ত হয়েছে। সমস্যা আরও গভীরে চলে গেছে। সময় পেলে সমস্যা নিজেই শিকড় মাটির অনেক গভীরে নিয়ে যায়—শাখা-প্রশাখার জন্ম দিয়ে সে একটি জটিল বটবৃক্ষের মতো হয়ে পড়ে। যার প্রমাণ আমেরিকা আফগানিস্তানে পেয়েছে। দশ বছরের বেশি সময় কয়েক ট্রিলিয়ন ট্রিলিযন মার্কিন ডলার ব্যয় করেও শেষ অবধি দেখা যাচ্ছে—আফগানিস্তানে জঙ্গিরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
আমেরিকার এই দশা কেন হয়েছে, তার উত্তর ১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রায় এক দশক পরে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমেরিকার প্রেসারের মুখেও তিনি কীভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জয়ী হতে সমর্থ হলেন। ইন্দিরার উত্তর ছিল, “It was Hindu philosophy and the deep commitment of India” (বাস্তবে এটা হিন্দু ফিলোসফি ও ভারতের কমিটমেন্টের কারণেই সম্ভব হয়েছিল)।
বাস্তবে ইন্দিরা জানতেন যুদ্ধ শুরুর থেকে যুদ্ধ থেকে সফলভাবে বের হয়ে আসাই বড়। কারণ যুদ্ধ শুরু করে যদি যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ আগে থেকেই জানা না থাকে, তাহলে সেটা হয় মহাভারতে বর্ণিত অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেদের মতো। অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করে যুদ্ধে ঢুকতে জানতেন, বের হতে জানতেন না। তিনি ওই ব্যুহতে প্রবেশ করেছিলেন অন্যরা তাকে বের হতে সাহায্য করবে এই ভরসায়। আর কোনো যুদ্ধ থেকে নিজে বের হতে না জানলে বড় বড় মহারথীরাও গদা হাতে, মুষল হাতে দাঁড়িয়ে শুধু ফুঁসতেই পারে। বের করে আনতে পারে না। তার প্রমানের জন্য শুধু এই কাহিনী নয়, যুদ্ধ শুরুর থেকে বের হতে জানাটাই বড় এটাই এর মূল বক্তব্য।

তাই যে কোনো জঙ্গিবাদী বা নরহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী না করে কত দ্রুত কীভাবে জয়লাভ করে বের হয়ে আসা যায়, এটাই মূল বীরের বা রাজনীতিকের কাজ। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এর সবচেয়ে সফল নায়ক শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। পাকিস্তানের নরহত্যাকারী ও জঙ্গি মানসিকতার সামরিক বাহিনী অধিকৃত এই বাংলাদেশকে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের যুদ্ধে জয় করে দ্রুতই সম্পূর্ণরূপে ওই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যান শ্রীমতি গান্ধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এ ধরনের উদাহরণ আর একটিও নেই।
এমনকি পাকিস্তান থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশ সৃষ্টি ও এক কোটি শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনের মতো একটি জটিল বিষয়কে আমেরিকা-চায়নার মতো শক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র নয় মাসে এর সমাধান করেন। তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর ইতিহাসজ্ঞান, তাঁর নেতৃত্ব পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতেন, সমস্যাকে এক, দুই, তিন পর্ব এভাবে পার হতে দিলে সে আরও বেশি শক্তিশালী হয়। তাই প্রথম পর্বেই তাকে শেষ করতে হয়। গোল্ডেন টেম্পলের ক্ষেত্রেও ইন্দিরা গান্ধী যেমন তথাকথিত গোয়েন্দা বা পরামর্শকদের ওপর নির্ভর করেননি। নিজের প্রজ্ঞা ও সাহস দিয়ে তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের যুদ্ধও তিনি করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ভৌগোলিক সামরিক জ্ঞান দিয়ে।
বাংলাদেশের যুদ্ধে তিনি যত না সামরিক শক্তির ওপর জোর দিয়েছিলেন, তার থেকে বেশি কাজে লাগিয়েছিলেন ভৌগোলিক শক্তি ও পৃথিবীর জনমত আর সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তিকে।
আজ ভারত নিজে ও তার প্রতিবেশী শুধু নয়, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশও নানান আবরণের জঙ্গি ও উগ্রতাকবলিত—যা মানুষ, দেশ ও অর্থনীতি ধ্বংস করে পৃথিবীকে পেছনের দিকে নিয়ে যাবে। এ সময়ে তাই শুধু এ উপমহাদেশ নয়, পৃথিবীকে ফিরে তাকাতে হবে ভারতের মহীয়সী নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর দিকে। তাঁর কাজের ভেতর বা কাজের পথ ধরেই এই উপমহাদেশসহ পৃথিবীতে উগ্রতায় আক্রান্ত দেশগুলোকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া নেতা-কর্মী ও “শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই”
সাংবাদিক শফিকুর রহমান: ধাবমান কালের গর্ভে তিনিও চলে গেলেন
বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
একাত্তরে দুর্গা নয়, ইন্দিরা গান্ধী; কারাগারে চিম্ময় ও গাঁয়ের মেয়ে দুর্গা











