ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়েছে, অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং দেশটি বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব অর্জনের পরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে কি না।
ভারতের অর্থনীতি বছরে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এই প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। চীনের প্রবৃদ্ধির তুলনায়ও ভারত এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির এই অগ্রগতি ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট হচ্ছে না। কারণ, প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকার পরিবর্তনে অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।
গুজরাট মডেলের সাফল্য
মোদির অর্থনৈতিক নেতৃত্বের আলোচনায় বারবার উঠে আসে গুজরাটের উদাহরণ। ২০০১ সালে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, এই উন্নয়ন মডেলই পরবর্তী সময়ে তাঁকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
গুজরাটে মাথাপিছু আয় ২০০১ সালের কয়েক শ ডলার থেকে বেড়ে স্থির মূল্য বিবেচনায় বর্তমানে ৪ হাজার ডলারের কিছু বেশি হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে গুজরাট ভারতের তুলনামূলক সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোর একটি।
পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের ভোটারদের মধ্যেও গুজরাটের মতো উন্নয়নের প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় অর্থনীতিতে মোদির অর্জন
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি সরকার অর্থনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। করব্যবস্থার সংস্কার, ডিজিটাল সেবার বিস্তার, সড়ক ও বিমানবন্দর নির্মাণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগ অর্থনীতির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব উদ্যোগের ফলে চরম দারিদ্র্য কমেছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং বিশেষ সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ এবং শ্রম আইন পরিবর্তনের উদ্যোগকেও অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোদির সমালোচকেরাও স্বীকার করেন, তাঁর সময়ে ভারতের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে।
চীনের অভিজ্ঞতা যে শিক্ষা দিচ্ছে
ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গতি বোঝার ক্ষেত্রে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সঙ্গে তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২৫ বছর আগে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময় শি জিনপিং চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের নেতৃত্বে ছিলেন। দুই নেতাই নিজ নিজ অঞ্চলের উন্নয়নকে জাতীয় নেতৃত্বে পৌঁছানোর সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ফুজিয়ানে মাথাপিছু আয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের। কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিল্প ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; জনসংখ্যার বয়স বাড়ার আগেই অর্থনীতিকে উচ্চ আয়ের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি থেকে শিল্প ও সেবা খাতে শ্রমশক্তির স্থানান্তর ত্বরান্বিত করতে হবে।
ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোয় এই পরিবর্তন এখনো প্রত্যাশিত গতিতে ঘটছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।












