ভারতের মুদ্রা রুপির দরপতন ঠেকাতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) গত কয়েক মাসে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছ থেকে ডলার আমানত সংগ্রহে বেশি সুদের প্রস্তাব, বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ রুপি কেনা, মুদ্রা নিয়ে জল্পনামূলক লেনদেনে বিধিনিষেধ এবং বিদেশি মুদ্রার ঝুঁকি সামলাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি খরচ আরোপ—সবই করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এসব পদক্ষেপে কিছু সময়ের জন্য রুপির দরপতন থামানো সম্ভব হয়েছে। ডলারের বিপরীতে রুপির দাম প্রায় ৯৭ থেকে বেড়ে ৯৫-এর সামান্য নিচে আসে। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে ভারতের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, মুদ্রার বিনিময় হার ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে পরিমাণ হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক ও আর্থিক মূল্য ক্রমেই বাড়ছে।
বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে রুপির দাম ৯৫-এর নিচে ধরে রাখার বিষয়টি এখন একধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মার্চের শেষ দিকে রুপির দাম এই সীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর ব্যবস্থা নেয়। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এসব পদক্ষেপ ভারতের বাজার উদারীকরণের গত এক দশকের অগ্রগতিকে অনেকটাই পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পরও রুপির দরপতন পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার ডলারের বিপরীতে ৯৫-এর সীমা অতিক্রম করে রুপি। এরপর বাজারে নতুন করে আলোচনায় আসে ডলারের বিপরীতে রুপির দাম ১০০-তে পৌঁছানোর আশঙ্কা।
অর্থনীতিবিদ অজয় শাহ এই পরিস্থিতিকে নিয়মিত ব্যবধানে নির্দিষ্ট সংখ্যার সীমা ঘিরে বাজারের লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ১০০-এর মতো একটি পূর্ণসংখ্যা বাজারে বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব তৈরি করে।
রুপির দরপতন কেন রাজনৈতিক বিব্রতকর

ভারতে রুপির মূল্য কমে যাওয়াকে শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। দেশটির স্বাধীনতার পর থেকেই মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের বৈদেশিক লেনদেনের সংকটের পর বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
২০১৩ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন রুপির বড় ধরনের দরপতনকে তিনি তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতি ও অদক্ষতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
এখন তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রুপির দাম ডলারের বিপরীতে ১০০-তে পৌঁছালে রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের আগে বিষয়টি বিরোধী দলগুলোর জন্য সরকারের সমালোচনার বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। প্রায় ২৪ কোটি মানুষের এই রাজ্য ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
রিজার্ভ ব্যাংক অবশ্য দাবি করছে, তাদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট বিনিময় হার ধরে রাখা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের পদক্ষেপের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দুভুরি সুব্বারাও সতর্ক করেছেন, কোনো মুদ্রার দর ধরে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তার পরিণতি আরও খারাপ হতে পারে। বাজার যদি বুঝতে পারে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহজেই পিছু হটতে পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
রুপির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বৈশ্বিক পরিস্থিতি
রুপির দরপতনের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিরও প্রভাব রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিদেশে বিপুল বিনিয়োগ এবং ভারতের শেয়ারবাজারের তুলনামূলক বেশি মূল্যায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের একটি অংশ অন্য বাজারে চলে গেছে। এতে রুপির চাহিদা কমেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। মার্চের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ভারত জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় বেশি দামে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কিনতে দেশটিকে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে রুপির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ দিয়ে মুদ্রার দর ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

রুপি রক্ষায় কমছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত
রুপির দরপতন ঠেকাতে সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বাজারে ডলার বিক্রি করে রুপি কেনার কারণে সেপ্টেম্বরে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার মজুত প্রায় ৫০০ কোটি ডলার কমেছে।
কিন্তু উদ্বেগ শুধু রিজার্ভ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুদ্রার আরও দরপতনের আশঙ্কা এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে।
রুপির দাম আরও কমবে—এমন ধারণা থেকে রপ্তানিকারকেরা বিদেশে পণ্য বিক্রির অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে দেরি করতে পারেন। আমদানিকারকেরা ভবিষ্যতে বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে ভেবে আগেভাগে বেশি পণ্য মজুত করতে পারেন।
বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়রাও দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে পারেন। গত অর্থবছরে প্রবাসী ভারতীয়রা দেশে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ। এই অর্থপ্রবাহে বিলম্ব হলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া রুপির অবমূল্যায়নের আশঙ্কায় ভারতীয়রা সোনার কেনাকাটা বাড়াতে পারেন। এতে ডলার ব্যয়ের চাপও বাড়বে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন রয়েছে, তারা সাধারণত ভবিষ্যতের বিনিময় হারের ঝুঁকি সামলাতে আগাম চুক্তি বা হেজিংয়ের আশ্রয় নেয়। কিন্তু এ ধরনের লেনদেন ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে গেলে ব্যবসার অনিশ্চয়তা বাড়ে।

এর পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বারবার ব্যাখ্যা, পরিবর্তন ও সংশোধনের প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ রুপির ওপর চাপ কমাতে ভারতের প্রয়োজন আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এসব পদক্ষেপে রিজার্ভ ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বাজারে এখন ধারণা তৈরি হয়েছে, ডলারের বিপরীতে রুপির দাম ৯৭-এর কাছাকাছি পৌঁছালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও হস্তক্ষেপ করবে, যাতে তা ১০০-তে না যায়। কিন্তু ঠিক ৯৭ বা ১০০ কেন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তার কোনো অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা নেই।
সাময়িক স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা
সর্বশেষ পদক্ষেপের পর রুপির দরপতন আপাতত থেমেছে। নতুন ঘোষণা কার্যকর হওয়ার পর প্রথম লেনদেনের দিন রুপির দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছিল। এরপরও কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।

২১ অক্টোবর ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক শেয়ারবাজারে ছাড়ের (আইপিও) শেয়ারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও রুপিকে সাময়িকভাবে সহায়তা করেছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে ভারতের জন্য স্বস্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ডলারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের উচ্ছ্বাস কমে গেলে আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহেও পরিবর্তন আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ হলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটিই নিশ্চিত নয়। ফলে রুপির দর ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম—সবকিছুর ওপর চাপ বাড়তে পারে।
মুদ্রার বিনিময় হারকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা তাই ভারতের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাময়িকভাবে রুপির পতন থামানো গেলেও এর পেছনে যে অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত মুদ্রাটিকে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাকেই আরও কঠিন করে তুলতে পারে।












