২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশে ৫ হাজার ৫১৫ শিশুর অপরিণত জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক এপ্রিল মাসের তুলনায় ওই সময়ে অপরিণত জন্মের এই সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত উষ্ণতা না থাকলে এসব শিশুর মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৪৭৯ জনের অপরিণত জন্ম হতো না বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহ মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রায় ৪৫ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছিল। ওই মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রতি এক হাজার জন্মে প্রায় ১৯টি অতিরিক্ত অপরিণত জন্ম হয়েছে। গবেষণায় বিবেচনা করা তিনটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই এই বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো শিশুর জন্ম হলে তাকে অপরিণত জন্ম বলা হয়। বিশ্বজুড়ে নবজাতকের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনেও নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় অর্ধেক ঘটনা
গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমের প্রভাব দেশের সব অঞ্চলে সমান ছিল না। অতিরিক্ত ৫ হাজার ৫১৫টি অপরিণত জন্মের প্রায় ৪৭ শতাংশ ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এই দুই বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ছিল ময়মনসিংহে। সেখানে ২০২৪ সালের এপ্রিলে তাপমাত্রা স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। দেশের আট বিভাগের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। ময়মনসিংহে প্রতি এক হাজার জন্মে অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের হার ছিল ২৪টি, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। মোট ঘটনার সংখ্যায় বিভাগটির অবস্থান অবশ্য ষষ্ঠ। অন্যদিকে সিলেটে এই হার ছিল প্রতি এক হাজার জন্মে ১৬টি, যা সবচেয়ে কম।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি বিভাগেই তাপপ্রবাহের কারণে অপরিণত জন্মের ঝুঁকি আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। ফলে শুধু মোট ঘটনার সংখ্যা দিয়ে তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব বোঝা সম্ভব নয়। জনসংখ্যা কম হলেও কোনো কোনো অঞ্চলে ঝুঁকি বৃদ্ধির হার বেশি হতে পারে।
২০৫০ সালের আগেই বাড়তে পারে ঝুঁকি
ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে গবেষণাটি। মধ্য শতাব্দীতে, অর্থাৎ ২০৪১ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে, একটি সাধারণ এপ্রিল মাসেও বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় এই সংখ্যা ৬৩০ থেকে ২ হাজার ৯০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এ সময় এপ্রিলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে ঢাকা বিভাগে অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। এরপর থাকবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ। তবে এই পূর্বাভাসে ধরে নেওয়া হয়েছে, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নতুন কোনো অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং তাপমাত্রার সঙ্গে অপরিণত জন্মের ঝুঁকির বর্তমান সম্পর্ক একই থাকবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে জন্মের সম্ভাব্য সংখ্যার পরিবর্তনও হিসাবে রাখা হয়েছে।
গর্ভবতী নারীদের জন্য কেন বেশি বিপজ্জনক গরম
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি শারীরিক চাপ তৈরি হয়। তীব্র গরমে পানিশূন্যতা, শরীরে রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন, গর্ভফুলে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়া এবং প্রদাহের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা উম্মে হাফসা মজুমদার বলেন, অতিরিক্ত গরম গর্ভবতী নারীদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। এতে মা ও গর্ভের শিশুর জন্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। দারিদ্র্য, রক্তস্বল্পতা, শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া এবং ঘর ঠান্ডা রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশেষ করে বাতাস চলাচলের সুযোগ কম এমন ঘর কিংবা তাপ আটকে রাখে এমন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি বাড়িতে বসবাসকারী নারীরা বেশি বিপদে পড়তে পারেন।
মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করতে হবে তাপপ্রবাহের সতর্কতা
তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ যৌথভাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের তাপজনিত অসুস্থতা থেকে সুরক্ষায় জাতীয় নির্দেশিকা চালু করে। এতে অপরিণত জন্মের ঝুঁকিও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি যুক্ত হয়নি।
গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তাপজনিত ঝুঁকি সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পানের ব্যবস্থা, নিরাপদ ও শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা আরও কার্যকর করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা। যেসব বিভাগে মোট অপরিণত জন্মের সংখ্যা বেশি, সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব এলাকায় ঝুঁকি বৃদ্ধির হার বেশি, সেগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জোয়ান বেন্টলি-ম্যাককুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে। এতে অপরিণত জন্মের ঝুঁকি ও শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। অথচ উচ্চ আয়ের ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়ার বেশি ক্ষতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো ও আগাম সতর্কব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে কিছু ঝুঁকি কমানো সম্ভব হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি ঠেকাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত করা জরুরি।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড পাবলিক হেলথের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির বলেন, এই গবেষণার ফল বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা। গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের সুরক্ষায় মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো, ঝুঁকি শনাক্ত ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।












