বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে ভারত। একই সঙ্গে ঢাকার সঙ্গে ইতিবাচক, ভবিষ্যতমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় দেশটি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। ভারত এসব পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য ইতিবাচক ও গঠনমূলক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত সফরের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ আগেই জানানো হয়েছে। সফর নিয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে।
এর আগে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছিলেন, সুবিধাজনক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সফরটি হবে যথাযথ দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায়।
ঢাকায় বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ প্রয়োজন। ভারত সফরে দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
গঙ্গার পানি চুক্তিতে বাংলাদেশের নতুন অবস্থান
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়নের পরিবর্তে নতুন অথবা সংশোধিত চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তাসংবলিত ধারা যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
এ লক্ষ্যে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখেই আলোচনায় সর্বোত্তম ফল অর্জনের চেষ্টা করা হবে। পানি সমস্যাসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও জানিয়েছেন, গঙ্গার পানি বণ্টনসহ অভিন্ন নদীগুলোর বিষয়ে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা হবে। এ বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।
১৯৭৭ সালের চুক্তির নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনতে চায় ঢাকা
বাংলাদেশের পানি আলোচনায় এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ১৯৭৭ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নিশ্চয়তামূলক ধারা।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি সুরক্ষাব্যবস্থা ছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ নির্ধারিত মাত্রার নিচে নেমে গেলে এবং বাংলাদেশের নির্ধারিত হিস্যা কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে, বাংলাদেশকে প্রাপ্য পানির অন্তত ৮০ শতাংশ সরবরাহ করতে হবে।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে থাকা এই নিশ্চয়তামূলক ধারা ফিরিয়ে আনা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। কিন্তু গঙ্গা ছাড়া অন্য কোনো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই। ফলে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোও আলোচনার বিষয়
পানি বণ্টনের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। এই ব্যবধান কমাতে সরকার কাজ করতে চায়। তবে যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনার টেবিলে বসা জরুরি।
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও যোগাযোগের ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে গঙ্গার পানি চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যু সামনে রেখে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আলোচনার ফল কতটা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে, তা নির্ভর করবে নতুন পানি চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমের পানির নিশ্চয়তা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতির ওপর।
গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের আলোচনাই আগামী দিনের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।












