বার্ড ফ্লুয়ের সংক্রমণ থামাতে শুধু পোলট্রি খামারের দরজা বন্ধ রাখলেই হবে না। কারণ ভাইরাসের বিস্তার খামারের সীমানা মানে না। বন্য পাখির চলাচল, মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সংস্পর্শ, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খামারের বর্জ্য—সবকিছুই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রোগের প্রাদুর্ভাবের পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সংক্রমণের পরিবেশগত ও সামাজিক কারণগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পোলট্রি উৎপাদন, খামারিদের জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও দেখিয়েছে, এই ঝুঁকি এখনো বাস্তব।
গত মার্চে কম্বোডিয়ায় অসুস্থ ও মৃত মুরগির নমুনা পরীক্ষার সূত্র ধরে তদন্তে একজন মানুষের শরীরে এইচ৫এন১ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। জুনে অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মতো পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পথ খামার, বন্য প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সংযোগের মধ্যেই তৈরি হতে পারে।

মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একসূত্রে
গত ১২ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা গ্রহণ করেছে। এতে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও পুনরাবির্ভাবের মূল কারণ মোকাবিলায় ‘এক স্বাস্থ্য’ বা ওয়ান হেলথ ধারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের সুস্থতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস, প্রাকৃতিক আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তার বন্য প্রাণী ও মানুষের মধ্যে সংস্পর্শ বাড়াচ্ছে। এতে নতুন রোগজীবাণুর বিস্তার বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনোর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও অতিবৃষ্টির মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এতে পশুপালন, পানির সরবরাহ এবং স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পোলট্রি খামারের বর্জ্যও ঝুঁকি বাড়ায়। বর্জ্যের সঙ্গে থাকা বিষ্ঠা, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ ও রোগজীবাণু পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
শনাক্তকরণের চেয়ে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো রোগ পর্যবেক্ষণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তা শনাক্ত করা যথেষ্ট নয়। রোগের ঝুঁকি কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা আগে থেকে বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ জন্য প্রাণিস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, বন্য প্রাণী ও পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় প্রয়োজন। বন্য প্রাণীর চলাচল, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং মানুষের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শের ধরন রোগের বিস্তারকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব তথ্য নজরদারির আওতায় না এলে সংক্রমণের পরিবেশগত কারণগুলো অজানা থেকে যাবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশের সরকারকে বার্ড ফ্লু শনাক্তকরণ ও নজরদারিতে সহায়তা করছে। জীবন্ত পাখির বাজারে পাখির নমুনার পাশাপাশি বাজারের পরিবেশও পরীক্ষা করা হয়। এতে ভাইরাসের ধরন ও সংক্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া সম্ভব।
কম্বোডিয়ার বন্য প্রাণীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে তথ্য বিনিময় করে। মার্চে পোলট্রিতে এইচ৫এন১ শনাক্ত হওয়ার পর তদন্তে মানুষের সংক্রমণও ধরা পড়ে। এ ঘটনা দেখায়, প্রাণীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত কাজে লাগানো গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়ায় এফএও ও দেশটির বন মন্ত্রণালয় বন্য প্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের এক স্বাস্থ্যনীতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বন্য প্রাণীর বাণিজ্য এবং মানুষ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সংযোগ থেকে তৈরি রোগঝুঁকি মোকাবিলা এ উদ্যোগের লক্ষ্য। সুলাওয়েসিতে সরকার, গবেষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকারগুলোর তিনটি করণীয়
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর এখন তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি বন্য প্রাণী ও পরিবেশের তথ্যও রোগ পর্যবেক্ষণে যুক্ত করতে হবে। এতে ঝুঁকির পরিবর্তন বোঝা এবং কোথায় নজরদারি ও খামারের জীবাণুনিরাপত্তা জোরদার করা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ের দক্ষ জনবল ও পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। পশুচিকিৎসক, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ কর্মকর্তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন, অস্বাভাবিক অসুস্থতা বা প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের দক্ষতা থাকতে হবে। সংগৃহীত তথ্য নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোও জরুরি।
তৃতীয়ত, জাতীয় রোগ প্রতিরোধ পরিকল্পনায় সংক্রমণের উৎস পর্যায়ে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভূমির ব্যবহার, বন উজাড়, আবাসস্থলের পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয়, পোলট্রি পালনের পদ্ধতি এবং মানুষ ও প্রাণীর পারস্পরিক যোগাযোগ—সবকিছুর প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ কাজে বন্য প্রাণী ও পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সব প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু রোগের ঝুঁকি কীভাবে খামার, জনবসতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তৈরি হয়, তা আগে থেকে বুঝতে পারলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। বার্ড ফ্লু মোকাবিলায় তাই শুধু আক্রান্ত প্রাণী বা খামারের দিকে নজর দিলে চলবে না; রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশও বদলাতে হবে।
মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর সুরক্ষা ও কৃষকের জীবিকা রক্ষার জন্য প্রাদুর্ভাবের অপেক্ষা না করে ঝুঁকির উৎসেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
লেখকঃ আলুয়ে দোহং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহকারী মহাপরিচালক এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রতিনিধি। ৩ নভেম্বর পালিত এক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে নিবন্ধটি লেখা।












