যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের বিজয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছেন। কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তাঁর প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের পথ কঠিন হয়ে উঠছে। তবে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে যথেষ্ট নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতা থাকলেও মেয়াদের শেষ দুই বছরে তিনি কতটা কার্যকরভাবে তা প্রয়োগ করতে পারবেন।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর হোয়াইট হাউসের সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে ওভাল অফিসে নিজের ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির সঙ্গে লেখা ছিল, ‘ট্রাম্প এখনো আপনাদের প্রেসিডেন্ট।’
বার্তাটি ছিল রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট। নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেলেও তিনি যে ক্ষমতায় রয়েছেন এবং নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি, সেটিই তুলে ধরতে চেয়েছে হোয়াইট হাউস।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দেয়নি, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে তাঁর প্রেসিডেন্টের মেয়াদের বাকি সময় যত কমবে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাও তত বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
কংগ্রেস ছাড়াও যেসব ক্ষমতা থাকছে ট্রাম্পের হাতে
ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তই কংগ্রেসে আইন পাসের মাধ্যমে নয়, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ, ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সামরিক অভিযান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন খাতে কংগ্রেস অনুমোদিত ব্যয় একতরফাভাবে কমিয়ে দেওয়া।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও এসব নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ট্রাম্পের থাকবে। এমনকি ডেমোক্র্যাটরা তাঁর সিদ্ধান্ত সীমিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তাতে ভেটো দিতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ট্রাম্পের ভেটো ঠেকানো সহজ হবে না।
তবে সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকা আর রাজনৈতিকভাবে তা প্রয়োগ করতে পারা এক বিষয় নয়। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত অবস্থান এবং নিজ দলের ভেতরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ট্রাম্পের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
রিপাবলিকান শিবিরেও বাড়ছে দূরত্ব
গত দুই বছর রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য থেকে শুরু করে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের তিনি রাজনৈতিক সুবিধা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের অবস্থানের সঙ্গে ধরে রেখেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেই নিয়ন্ত্রণে ফাটলের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা এখন প্রকাশ্যেই তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন, যা কয়েক মাস আগেও দলটির ভেতরে বিরল ঘটনা ছিল।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া এসেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে। ইরানে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধকে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ভ্যান্স প্রশ্ন তোলেন, ইরানের যুদ্ধের কারণে সিনেটে আগামী ছয় বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো কি সত্যিই সার্থক ছিল? তাঁর বক্তব্য, কেন রিপাবলিকানরা হেরেছে, তা সবাই জানে। ভবিষ্যৎ নিয়ে সৎ আলোচনা করতে হলে ইরান যুদ্ধের দায় স্বীকার করেই শুরু করতে হবে।
ভ্যান্সের এই মন্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা নয়; ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকেই তাঁর পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রকাশ।
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার পদ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সহযোগী সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মতামত জানতে চাইছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্প এ ধরনের পরিবর্তনের খবর অস্বীকার করেছেন।
এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ২০০৬ সালের একটি ঘটনার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যাবে। সে বছর মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক ডেভিড মিলারের মতে, রিপাবলিকানদের একটি অংশ এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে। তারা নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, অথবা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যাতে ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়।
ট্রাম্পের সামনে সময়ের চাপ
নির্বাচনের পরপরই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। কখনো সহযোগিতার কথা বলেছেন, আবার কখনো ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবিত আইন আটকে দিতে ভেটো প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন।
বুধবার হোয়াইট হাউসে নিজের নির্মাণাধীন বলরুমের কাজ চলার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ধ্বংসাত্মক আচরণ না করলে তাঁদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবেন। তবে তাঁর হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে। ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও একই ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট এখনো প্রাসঙ্গিক এবং তাঁর হাতে ক্ষমতা রয়েছে। তবে ক্লিনটনের সামনে তখন রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় ছিল। পরের বছর তিনি পুনর্নির্বাচিতও হন।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তাঁর প্রেসিডেন্টের মেয়াদের আর মাত্র দুই বছর বাকি। ফলে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের সময় সীমিত।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত অবস্থান, রিপাবলিকানদের মধ্যে অসন্তোষ এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য তাঁকে ক্রমাগত চাপে রাখবে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী আদেশ, ভেটো এবং সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এখনো রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগের সাংবিধানিক সুযোগ থাকলেই যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অটুট থাকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করা ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বরং নিজের দলের সমর্থন ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখা। মেয়াদের শেষ দুই বছরে তাঁর ক্ষমতার প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করবে এই দুই বিষয়ই।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ফলে তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ।












