মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০৩০ সালে। এর পর তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন বলে একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি সংবিধান পরিবর্তন করে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই ঘোষণার পরও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠেছে। সিসিপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তাঁকে আরও এক মেয়াদ ক্ষমতায় রাখার জন্য সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। বিপরীতে, রাজনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি অংশ বলছে, এমন উদ্যোগ গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতিকে দুর্বল করবে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মিসরের প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা এবং ২০৩০ সালের পর দেশটির নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই প্রশ্ন।
সিসির ঘোষণা, সমর্থকদের সংবিধান বদলের দাবি
গত ১৪ অক্টোবর সিসি স্পষ্টভাবে বলেন, সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। ১৭ অক্টোবরও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, ২০৩০ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এমনকি ওই সময়ের পর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহীদের প্রস্তুত করার জন্য সামরিক একাডেমির ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর পরপরই সিসিকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে প্রচার শুরু হয়। সমর্থকদের দাবি, সংবিধান সংশোধন করে তাঁকে আরও মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
এই অবস্থানের পক্ষে সরব হয়েছেন প্রভাবশালী টেলিভিশন উপস্থাপক ও আল-আহরাম পত্রিকার সাংবাদিক আহমেদ মুসা এবং সংসদ সদস্য মোস্তফা বকরী। দুজনই সিসিপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং সাদা আল-বালাদ টেলিভিশনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
মুসার যুক্তি, মিসর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সিসির বিকল্প নেই। ২৭ অক্টোবর নিজের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সংবিধান জনগণের তৈরি, তাই জনগণ চাইলে সেটি পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর মতে, ১২ কোটি মিসরীয় নাগরিকের মতামত গণভোটের মাধ্যমে নেওয়া যেতে পারে।
তিনি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, অন্য দেশেও নেতাদের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা কিংবা মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
৩০ অক্টোবর নিজের অনুষ্ঠান ‘ফ্যাক্টস অ্যান্ড সিক্রেটস’-এ বকরী আরও সরাসরি বলেন, সিসিকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে সিসির রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্প শেষ করার জন্য আরও সময় দরকার।
সংবিধান সংশোধনের বিরোধিতায় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী
তবে এই দাবির বিরোধিতা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসাম বাদরাওয়ি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংকট বা আঞ্চলিক অস্থিরতার অজুহাতে বারবার সংবিধান পরিবর্তন করা বিপজ্জনক। সিসিকে আরও ছয় বছর ক্ষমতায় রাখার জন্য সংশোধন আনা হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
বাদরাওয়ি মনে করেন, সংবিধান অক্ষুণ্ন রাখাই প্রয়োজন, যাতে জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বেছে নিতে পারে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত হয়।
তিনি ২০১১ সালের জানুয়ারির গণ-আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে একজন প্রেসিডেন্ট মেয়াদ শেষে সরে দাঁড়াবেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতা দায়িত্ব নেবেন।
সিসিকে উদ্দেশ করে তিনি তিনজন ডেপুটি নিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, তাঁদের একজন হবেন বেসামরিক রাজনীতিক, একজন সামরিক পটভূমির ব্যক্তি এবং অন্যজন নারী। ২০৩০ সালে জনগণ তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করতে পারবে।
দেশটির দৈনিক আল-মাসরি আল-ইয়াওমের মালিক ব্যবসায়ী সালাহ দিয়াবও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের দাবি মিসর কিংবা সিসি—কারও স্বার্থ রক্ষা করে না। বরং রাজনৈতিক জীবনকে স্থবির করে রাখে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পথ বন্ধ করে দেয়।
অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে সতর্কবার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমর হাশেম রাবি মনে করেন, সিসির বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে কিছু মানুষের আস্থার অভাব থেকেই সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠছে। তাঁর মতে, এই বিতর্ক বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিকল্প নেতৃত্ব সামনে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি মিসরের অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ১৯৮০ সালে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের পুনর্নির্বাচনের মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত অনির্দিষ্টসংখ্যক মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান। ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর উত্তরসূরি হোসনি মোবারক এই ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকেন।
পরবর্তী সময়ে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে মোবারকের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ তাঁর ছেলে গামালকে ক্ষমতার উত্তরসূরি করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোবারকবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দেয়।
রাবির আশঙ্কা, সিসিপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং টেলিভিশন আলোচনা ব্যাপক আকার ধারণ করলে প্রেসিডেন্ট তাঁর বর্তমান অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ফলে ২০৩০ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে মিসরের রাজনৈতিক বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।












