ভূমিকম্প, সুনামি, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপান ২ নভেম্বর নতুন একটি কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা চালু করেছে। দেশটির লক্ষ্য দুর্যোগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া।
জাপান চারটি ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জাপানে ঘটে। ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি, ২০২৪ সালের নোতো উপদ্বীপের ভূমিকম্প এবং চলতি বছরের কুমামোতো অঞ্চলের শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির দুর্যোগঝুঁকির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী ৩০ বছরে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ। একই সময়ে জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের নানকাই ট্রাফ এলাকায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশঙ্কাও রয়েছে। বিভিন্ন মডেল অনুযায়ী, এ ধরনের ভূমিকম্পে প্রায় তিন লাখ মানুষের মৃত্যু, ১ কোটি ২৩ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং ২৯২ ট্রিলিয়ন ইয়েন অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এটি জাপানের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি।
নতুন সংস্থাটিতে প্রায় ৩৫০ জন কর্মকর্তা কাজ করবেন। এর মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত ছিল। ফলে বড় দুর্যোগের সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিত।
ভূমিকম্পের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। চলতি বছর টোকিওতে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত টানা ৩৭ দিন বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৮৮৬ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর দীর্ঘতম। পাশের চিবা অঞ্চলেও রেকর্ড বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু ভূমিকম্পের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
জাপানের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য দুর্যোগের পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভূমিকম্পের সময় সরাসরি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মানসিক চাপ ও চিকিৎসার অভাবে পরে মারা যান। কুমামোতো ও নোতো অঞ্চলের দুর্যোগে এ ধরনের মৃত্যুর হার ছিল যথাক্রমে ৮০ শতাংশের বেশি এবং ৭০ শতাংশ। নতুন সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব হবে স্থানীয় প্রশাসনকে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করা।
জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তিনটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে—সরকারি সহায়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতি। নতুন সংস্থার উদ্বোধনের দিনই সরকার স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের আসবাবপত্র নিরাপদে আটকে রাখা এবং অন্তত তিন দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে এক সপ্তাহের জরুরি সরঞ্জাম রাখতেও বলা হয়েছে।
মূল বার্তা হলো, জাপান এখন শুধু দুর্যোগের পর উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ওপর নির্ভর করতে চায় না। বরং আগাম প্রস্তুতি, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নাগরিকদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে ভবিষ্যতের আরও বড় ও জটিল দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে চায়।












