যুক্তরাজ্যে পড়তে যেতে চাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পথ কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটির অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভর্তির প্রস্তাব ফিরিয়ে নিচ্ছে। ভর্তির প্রস্তাব বাতিল হলে শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের স্টাডি ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার দাঁড়িয়েছে ২৩.৫ শতাংশে। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৭.১ শতাংশ। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়াও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কড়া নিয়ম চালু করেছে। ফলে বিদেশে পড়ার ভিসা নিয়ে পরিকল্পনা করা পরিবারগুলোকে এখন আরও সতর্ক হতে হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের এই চাপের মূল কারণ দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তরের একটি নিয়ম। সেপ্টেম্বরে নিয়মটি আরও কড়া করা হয়েছে। এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৫ শতাংশের বেশি ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে বিপদ। সেই প্রতিষ্ঠান বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। আগে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ। ভিসা প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান এনরোলির তথ্য বলছে, প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে এই সীমা পেরিয়ে গেছে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা দেশ থেকে শিক্ষার্থী নেওয়া কমাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে সব দেশ মিলিয়ে প্রত্যাহারের হার ১০.৫ শতাংশে উঠেছে। আগের বছর তা ছিল ২.৩ শতাংশ। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে হার ৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৪০.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে সরাসরি ভিসা প্রত্যাখ্যানও আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতারা এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথ বলেছেন, ভিসা প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত। তাঁর মতে, অনেক প্রত্যাখ্যানের পেছনে অসংগত ও ব্যক্তিগত বিচারের ছাপ রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য জেমস মিলারও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এ বছর অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থী ২০ শতাংশের বেশি কমতে পারে। এতে কর্মী ছাঁটাই অনিবার্য হয়ে উঠবে বলেও তিনি মনে করেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলছে, অভিবাসন ব্যবস্থার সততা ক্ষুণ্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী নিতে পারবে না।
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে ২ অক্টোবর থেকে। এখন বেশির ভাগ নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিতে পারবেন না। পিএইচডি শিক্ষার্থী, সরকারি বৃত্তিধারী এবং আসিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের শিক্ষার্থীরা এর বাইরে থাকবেন। বাংলাদেশ এই ছাড়ের তালিকায় নেই। ভিসা পাওয়ার পরে পরিবারের সদস্য যোগ করার সুযোগও বন্ধ হয়েছে। ওয়ার্কিং হলিডেসহ কয়েক ধরনের অস্থায়ী ভিসায় থাকা ব্যক্তিরা দেশটিতে বসে আর স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে পারবেন না। পড়া শুরুর পর প্রথম ১২ মাস প্রতিষ্ঠান বদলানো যাবে না। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠান বদলাতে আলাদা ট্রান্সফার ভিসা লাগবে। দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল বলেছেন, শিক্ষার্থী বাজারের আকার নিয়ন্ত্রণ থেকে সরকার পিছু হটবে না।
বাংলাদেশের জন্য এই দুই দেশের পরিবর্তন বড় বার্তা দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া অনেক দিন ধরেই ওপরের দিকে। দুই দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেক পরিবারও আত্মীয়দের পড়াশোনার জন্য সেখানে নিতে চান। নতুন বাস্তবতায় বিদেশে পড়ার ভিসা পেতে কাগজপত্র নির্ভুল ও সত্য রাখা আগের চেয়ে বেশি জরুরি। কোন কোর্সে পড়বেন, কেন পড়বেন, পড়া শেষে কী করবেন, এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর তৈরি রাখা দরকার। পরিবার সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে অস্ট্রেলিয়ার নতুন নিয়ম আগেই ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। বিদেশে পড়ার ভিসা নিয়ে কোনো এজেন্সির মুখের কথায় ভরসা না করে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য মিলিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ।












