খুব গরম চা বা কফি নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে নতুন এক বড় গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণ পানীয়ের তাপমাত্রা যত বেশি, খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া যেসব মানুষ চা বা কফি ‘খুব গরম’ অবস্থায় পান করতেন, তাদের খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে উষ্ণ পানীয় পানকারীদের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল। তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, সামগ্রিকভাবে এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এখনও কম।
৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেই ঝুঁকি
গবেষণাটি করেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। আন্তর্জাতিক ক্যানসারবিষয়ক একটি গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৮২ জন মধ্যবয়সী নারী-পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে ‘খুব গরম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এমন তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির ভেতরের কোষের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ক্ষতি চলতে থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

শুধু পানীয়ের তাপমাত্রাই নয়, দিনে ছয় বা তার বেশি কাপ গরম পানীয় পান করলেও খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে দেখা গেছে।
ফুটন্ত চা কতটা গরম থাকে
কেটলি থেকে পানি পুরোপুরি ফুটিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চা তৈরি করলে পানীয়টির তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকতে পারে। কাপের মধ্যে ঢালার পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে।
ফলে এমন চা বা কফি মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পান করলে খাদ্যনালির ভেতরের সূক্ষ্ম কোষগুলোতে তাপজনিত ক্ষতি হতে পারে।
গবেষকদের পরামর্শ, পানীয় তৈরি করার পর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে সেটিকে কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা ভালো। দুধ মেশালেও পানীয়ের তাপমাত্রা সামান্য কমে। কিন্তু দুধ দেওয়া চা বা কফিও যদি খুব গরম থাকে, তাহলে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?
গরম পানীয় পান করার আগে ঠিক কত মিনিট অপেক্ষা করা উচিত, তার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ কাপের ধরন, পানীয়ের পরিমাণ, ঘরের তাপমাত্রা এবং পানীয় তৈরির পদ্ধতির ওপর ঠান্ডা হওয়ার সময় নির্ভর করে।
তাই সহজ নিয়ম হলো—পানীয়টি মুখে দেওয়ার মতো আরামদায়ক তাপমাত্রায় না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা। ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় দ্রুত পান না করাই ভালো।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক কেরেন পাপিয়ের বলেন, দক্ষিণ আমেরিকায় খুব গরম একটি ভেষজ পানীয় নিয়মিত পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের একই ধরনের সম্পর্ক আগের গবেষণাতেও দেখা গেছে। তবে কোন নির্দিষ্ট তাপমাত্রা থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বেশির ভাগ মানুষ কতটা গরম কফি সহ্য করেন?
অন্য একটি গবেষণায় ১১৮ জন তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন তাপমাত্রার কালো কফি পান করানো হয়েছিল। এতে দেখা যায়, বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারী ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার কফিকে অতিরিক্ত গরম মনে করেছেন।
অন্যদিকে বাইরে থেকে কেনা গরম কফির জন্য ৪৯ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে তুলনামূলকভাবে উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। কেউ যদি দীর্ঘ সময় গরম রাখতে চান, সে ক্ষেত্রে কফি ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পরিবেশন করা হতে পারে।
তবে সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও কম
গবেষকেরা ধারণা করছেন, মানুষ যদি খুব গরম পানীয় পান করা বন্ধ করে, তাহলে খাদ্যনালির ক্যানসারের প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল ধরনের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল। যুক্তরাজ্যে বছরে কয়েক হাজার মানুষ এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দেশটির জনসংখ্যার হিসাবে জীবদ্দশায় এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় এক শতাংশ।
অর্থাৎ খুব গরম চা বা কফি পান করলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এমন পানীয় পান করলেই কারও ক্যানসার হবে।
ধূমপান ও মদ্যপান আরও বড় ঝুঁকি
গবেষকেরা বলছেন, খাদ্যনালির ক্যানসারের পেছনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান উল্লেখযোগ্য।
ক্যানসার গবেষণাবিষয়ক সংস্থার বিশেষজ্ঞ ফিওনা অসগুনও বলেছেন, এই ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে ধূমপান না করা এবং মদ্যপান কমিয়ে আনা।
খাদ্যনালির ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বুকজ্বালা, বদহজম, গলা বা বুকে ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া। এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট্ট অভ্যাসেই কমতে পারে ঝুঁকি
চা বা কফি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত পানীয়। তাই এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে পান করার তাপমাত্রার দিকে নজর দেওয়াই হতে পারে সহজ সতর্কতা।
কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় দ্রুত পান না করে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করা, জিহ্বা বা মুখে আরামদায়ক মনে হলে পান করা এবং নিয়মিত অতিরিক্ত গরম পানীয় এড়িয়ে চলা—এই সামান্য অভ্যাসগুলো খাদ্যনালিকে অতিরিক্ত তাপের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















