কোনো সরকার শুধু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে গেলে, বিরোধী দল শক্তিশালী হলে কিংবা রাজপথে বড় আন্দোলন শুরু হলেই দুর্বল হয়ে পড়ে না। একটি সরকারের দুর্বলতার শুরু অনেক আগেই হতে পারে—বাজারে, থানায়, হাসপাতালে, সড়কে, ব্যাংকে, সরকারি দপ্তরে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কিংবা সাধারণ পরিবারের মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাবেই।
রাজনীতিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সরকারের শক্তি শুধু কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, নাগরিকদের সেবা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, অর্থনীতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর এবং জনগণের আস্থা কতটা ধরে রাখা যাচ্ছে—এসবই একটি সরকারের প্রকৃত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, তরুণ জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সরকারের কার্যকারিতা বিচার করে। বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে কি না, হাসপাতালে চিকিৎসা মিলছে কি না, রাস্তায় নিরাপদে চলাচল করা যাচ্ছে কি না, নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে আছে কি না, ঘুষ ছাড়া পাসপোর্ট বা জমির কাজ করা যাচ্ছে কি না—এসবই নাগরিকের কাছে সরকারের উপস্থিতি ও সক্ষমতার বাস্তব চিত্র।
অর্থনীতি দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়ে রাজনীতিতেও
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, রাজস্ব আদায়, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, তথ্যব্যবস্থা, নিরীক্ষা এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থানও এখানে বড় বিষয়। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাদের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়া শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক সমস্যাতেও পরিণত হতে পারে।
একজন বেকার বিশ্ববিদ্যালয়-স্নাতকের কাছে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি, বড় অবকাঠামো কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান খুব বেশি অর্থ বহন করে না, যদি সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে না পায়।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের চাপ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিল। একই মূল্যায়নে বলা হয়, নিম্ন আয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ার গতি তাল মেলাতে পারেনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
ধরা যাক, কারও আয় একই রয়ে গেছে। কিন্তু আগে যে পণ্য কিনতে ১০ হাজার টাকা লাগত, এখন সেটিই কিনতে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। বাস্তবে তার আয় কমে গেছে। মুদ্রানীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা কিংবা সরকারের অর্থনৈতিক সমন্বয়ের দুর্বলতা তখন সরাসরি মানুষের সংসারে গিয়ে আঘাত করে।
মানুষ মূল্যস্ফীতির হার দেখে জীবনযাপন করে না। তারা চাল, ডিম, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ এবং চিকিৎসার বিল দেখে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা আড়াল করা কঠিন।
যানজটও সরকারের সক্ষমতার মাপকাঠি
যানজটকে অনেক সময় রাজনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু ঢাকাসহ বড় শহরের একজন মানুষ যদি প্রতিদিন রাস্তায় তিন ঘণ্টা হারান, তাহলে ক্ষতি শুধু তার সময়ের নয়।
রাষ্ট্র হারায় উৎপাদনশীলতা, পরিবার হারায় মূল্যবান সময়, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয় এবং মানুষের মানসিক চাপ বাড়ে।
শুধু উড়ালসড়ক নির্মাণ করলেই নগর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হয় না। মানুষ কোথায় বসবাস করবে, কোথায় কর্মসংস্থান তৈরি হবে, গণপরিবহন কীভাবে পরিচালিত হবে, ফুটপাত কার জন্য থাকবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে যানজট সরকারের দূরদর্শিতার ঘাটতিই প্রকাশ করে।
সিদ্ধান্ত আছে, বাস্তবায়ন নেই
সরকার তখনই দুর্বল হতে শুরু করে, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কিন্তু তার বাস্তব ফল দেখা যায় না।
বাংলাদেশে নীতিমালা, কমিটি, তদন্ত কমিটি, কর্মপরিকল্পনা কিংবা প্রকল্পের অভাব সাধারণত খুব বেশি দেখা যায় না। সমস্যা বেশি দেখা দেয় সিদ্ধান্ত থেকে ফলাফলে পৌঁছানোর জায়গায়।
কোনো ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু পরে তার ফলাফল সম্পর্কে মানুষ আর জানতে পারে না। বাজার নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়, কিন্তু পণ্যের দাম কমে না। অবৈধ দখল উচ্ছেদের ঘোষণা আসে, কিন্তু কয়েক দিন পর আবার সেই দখল ফিরে আসে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা নাগরিকদের মনে একটি ধারণা তৈরি করে—সরকারের কথার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের সম্পর্ক দুর্বল।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি আস্থা কমায়
আরেকটি বড় সমস্যা হলো একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি। একটি মন্ত্রণালয় আরেকটিকে দায়ী করে, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারকে দায়ী করে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবসায়ীদের দিকে আঙুল তোলে, আবার ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে দায়ী করে।
কিন্তু নাগরিকের কাছে সরকার একটিই।
বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আমদানিকারক কিংবা জেলা প্রশাসনের সাংগঠনিক সীমারেখা নিয়ে সাধারণ মানুষ খুব একটা চিন্তিত নয়। তারা ফলাফল দেখতে চায়।
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সহজ নীতি হওয়া উচিত—সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের সমস্যা নাগরিকের সমস্যা নয়।
নীতির অনিশ্চয়তাও সরকারকে দুর্বল করে
সরকারের দুর্বলতার আরেকটি লক্ষণ হলো নীতির অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ীরা যদি না জানেন ছয় মাস পর করনীতি কী হবে, বিনিয়োগকারীরা যদি নিয়মকানুন কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সন্দিহান থাকেন কিংবা ব্যাংকের আমানতকারীরা ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঝুঁকি এড়িয়ে চলা অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
বিনিয়োগের পরিবর্তে অর্থ চলে যেতে পারে জমি, বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ কিংবা দেশের বাইরে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিপুল খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল আর্থিক অবস্থাকেও বিশ্বব্যাংক বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শুধু ‘সময় লাগবে’ বললে মানুষ আস্থা রাখে না
রাষ্ট্রের যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতাও সরকারের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সরকার সব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন হলে জনগণকে সেই সময়ের কারণ এবং পরিকল্পনা জানাতে হবে।
ধরা যাক, ব্যাংক খাত সংস্কারে তিন বছর প্রয়োজন। তাহলে সরকারকে জানাতে হবে, প্রথম ছয় মাসে কী করা হবে, এক বছরে কোথায় পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে এবং সংস্কার কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নাগরিকেরা কোন সূচকের মাধ্যমে বুঝতে পারবেন।
শুধু ‘সময় লাগবে’, ‘আমরা কাজ করছি’ কিংবা ‘আগের সরকার সমস্যাটি তৈরি করেছে’—এ ধরনের বক্তব্য দীর্ঘদিন মানুষকে সন্তুষ্ট রাখতে পারে না।
সরকারের ভাষা হওয়া উচিত স্পষ্ট ও সৎ—সমস্যাটি কী, বর্তমান অবস্থা কী, সমাধানে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, ছয় মাস পর কী ফল দেখা যাবে, এক বছর পর কোথায় পৌঁছানোর লক্ষ্য এবং ব্যর্থ হলে কার জবাবদিহি হবে।
শক্তিশালী সরকার মানে কম সমালোচনা নয়
একটি শক্তিশালী সরকার মানে এমন সরকার নয়, যার সমালোচক কম। বরং শক্তিশালী সরকার হলো সেই সরকার, যাকে নাগরিকেরা কার্যকর মনে করেন।
বাংলাদেশে সরকারকে শক্তিশালী করতে অসংখ্য স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কয়েকটি কঠিন কাজ বাস্তবায়ন করা।
প্রথমত, দল, পরিচয়, অর্থ কিংবা ক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো অপরাধী যেন আইনের বাইরে থাকতে না পারে—আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারের বড় প্রতিটি প্রতিশ্রুতিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করতে হবে এবং অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
তৃতীয়ত, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়—কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয়, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগকেও অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।
চতুর্থত, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, ব্যাংক, রাজস্ব বিভাগ, স্থানীয় সরকার এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার না বানিয়ে পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, ভুল স্বীকার করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
ভয় নয়, আস্থাই সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি
একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি ভয় নয়, জনগণের আস্থা।
মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যাবে, ব্যাংকে রাখা অর্থ নিরাপদ থাকবে, রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যাবে এবং ক্ষমতাবান কেউ অন্যায় করলেও শাস্তির বাইরে থাকবে না—তখনই রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
আর মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা যখন এর বিপরীত বার্তা দিতে থাকে, তখন সরকারের দুর্বলতা ঘোষণা করে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না।
মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তা বুঝে নেয়।
গণতন্ত্রের শক্তি তাই শুধু নির্বাচন বা সংসদের সংখ্যায় নয়; নাগরিকের প্রতিদিনের জীবনে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য—সেখানেই একটি সরকারের প্রকৃত শক্তির পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















