ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়ারের জাদুঘরে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জাদুঘরের বেড়া কেটে ভেতরে ঢুকে চারটি চিত্রকর্ম নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে দুই চোর। তবে পুলিশের ধাওয়া শুরু হলে দুটি চিত্রকর্ম বাগানে ফেলে পালিয়ে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত দুটি অমূল্য শিল্পকর্ম নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে চোরেরা।
ভোরে বেড়া কেটে জাদুঘরে প্রবেশ
মঙ্গলবার ভোর ৬টার কিছু আগে কাগন-সুর-মের শহরের রেনোয়ার জাদুঘরে ঢোকে দুই চোর। প্রথমে তারা জাদুঘরের বাগানের বেড়ায় গর্ত তৈরি করে। পরে একটি জানালা দিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে।
জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে সংকেত পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তখন চোরেরা চারটি চিত্রকর্ম নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে দুটি চিত্রকর্ম বাগানে ফেলে দেয় তারা।
যে দুই চিত্রকর্ম এখনো নিখোঁজ

চোরেরা যে দুটি চিত্রকর্ম নিয়ে পালিয়েছে, সেগুলোর একটি ‘মাদাম কোলোনা রোমানো’ এবং অন্যটি ‘কুয়োর পাশে তরুণী’। দুটি শিল্পকর্মই প্যারিসের ওর্সে জাদুঘরের মালিকানাধীন এবং রেনোয়ার জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য ধার দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ‘মাদাম পিশোঁ’ এবং ‘কোকো পড়ছে’ নামের দুটি চিত্রকর্ম চোরেরা ফেলে যায়। পুলিশের তৎপরতায় সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
অর্থ দিয়ে যার মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন
রেনোয়ারের শিল্পকর্মের মূল্য আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে বহু কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে চুরি যাওয়া চিত্রকর্ম দুটির গুরুত্ব শুধু আর্থিক মূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাগন-সুর-মেরের মেয়র ব্রায়ান ম্যাসন বলেন, এসব চিত্রকর্ম এমন সম্পদ নয় যা চোরেরা সহজে বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারবে। কারণ এগুলোর পরিচয় ও মালিকানা আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত।
ঘটনার পর সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে শিল্পকর্ম চুরির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে মার্সেইয়ের কৌঁসুলির দপ্তর।
যে বাড়িতে শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন রেনোয়ার
রেনোয়ার জাদুঘরটি শুধু একটি সাধারণ জাদুঘর নয়। এটি ছিল রেনোয়ারের নিজের বাসভবন। ১৯১৯ সালে এই বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
১৯৬০ সালে বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়। সেখানে রেনোয়ারের ১৩টি চিত্রকর্মের পাশাপাশি প্রায় ৪০টি ভাস্কর্য, আসবাবপত্র ও ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। ফলে এই জাদুঘরটি শিল্পপ্রেমীদের কাছে বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

ফ্রান্সের জাদুঘরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
রেনোয়ারের জাদুঘরে চুরির ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন ফ্রান্সের জাদুঘরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রকাশিত ফরাসি সংসদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যবান শিল্পকর্ম ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন সুরক্ষায় অনেক জাদুঘরের পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রস্তুতি নেই। এর আগে ২০২৪ সালের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে কোনো ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থাও ছিল না।
ইউরোপে বদলে যাচ্ছে শিল্পকর্ম চুরির ধরন
ইউরোপজুড়ে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় পুলিশ সমন্বয়কারী সংস্থার মতে, চোরেরা আগের তুলনায় আরও সহিংস পদ্ধতি ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে অস্থায়ী অপরাধী দলও গড়ে উঠছে।
গত বছরের অক্টোবরে প্যারিসের লুভর জাদুঘরে বড় ধরনের চুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ইউরো মূল্যের অলংকার চুরি হয়। এরপর ফ্রান্সের আরও কয়েকটি জাদুঘরেও চুরির ঘটনা ঘটেছে।
রেনোয়ার জাদুঘরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু দুটি চিত্রকর্ম চুরির ঘটনা নয়। এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ শিল্পঐতিহ্যের দেশ ফ্রান্সে জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে।
চোরেরা কি ফিরিয়ে দেবে রেনোয়ারের অমূল্য শিল্পকর্ম?
পুলিশের ধাওয়ার মুখে দুটি চিত্রকর্ম ফেলে গেলেও ‘মাদাম কোলোনা রোমানো’ ও ‘কুয়োর পাশে তরুণী’ এখনো নিখোঁজ। তদন্তকারীরা চোরদের শনাক্ত এবং চিত্রকর্ম দুটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
শিল্পবিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—অমূল্য এই দুই চিত্রকর্ম কোথায় এবং সেগুলো নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















