২৭ বছর বয়সে সাধারণত মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করেন—চাকরি, বাড়ি, ভ্রমণ কিংবা পরিবার নিয়ে। কিন্তু নিজের মৃত্যুর পর কী হবে, তা নিয়ে উইল লিখে রাখা এই বয়সে খুব একটা স্বাভাবিক বিষয় নয়। তবে যুক্তরাজ্যের তরুণী এরিন অ্যাটকিনসন ইতোমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছেন, তিনি মারা গেলে তাঁর অর্থ ও সম্পদের কী হবে।
এরিন বলেন, শুরুতে বিষয়টি তাঁর কাছে কিছুটা অবাস্তব মনে হয়েছিল। কারণ সাধারণত উইলকে বয়স্ক মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবেই দেখা হয়।
লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এরিন চার বছর আগে ব্রিস্টল থেকে লন্ডনে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি ভাড়া বাসায় থাকেন। নিজের সঠিক আয় প্রকাশ করতে না চাইলেও তিনি নিজেকে বিশেষ ধনী মনে করেন না। তারপরও নিজের কিছু সম্পদ কার কাছে যাবে, তা তিনি আগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
তাঁর প্রায় ৭ হাজার পাউন্ড মূল্যের গাড়িটি যাবে তাঁর বোনের কাছে। সঙ্গীর কাছ থেকে পাওয়া একটি সোনার হার তিনি তাঁর সঙ্গীকেই দিয়ে যেতে চান। পাশাপাশি নিজের অর্থের একটি অংশ এমন একটি কাজে দান করার ইচ্ছাও উইলে লিখে রেখেছেন, যেটি তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এরিন বলেন, জরায়ুর অভ্যন্তরীণ টিস্যু-সংক্রান্ত একটি রোগে আক্রান্ত নারীদের সহায়তা করে এমন একটি দাতব্য সংস্থা তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের। নিজের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ সেই প্রতিষ্ঠানে দান করার বিষয়টি লিখিতভাবে রেখে যেতে পেরে তিনি এক ধরনের ক্ষমতায়নের অনুভূতি পেয়েছেন।
তরুণদের কাছে উইল কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

অনেক তরুণই মনে করেন, তাঁদের এমন কোনো বড় সম্পদ নেই যার জন্য উইল করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সম্পদের পরিমাণ কম হলেও উইল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
২০২৫ সালের একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মাত্র পাঁচজনের মধ্যে একজনের উইল রয়েছে। ২২ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ। বিপরীতে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের উইল রয়েছে।
অনলাইনে উইল তৈরির একটি আবেদনভিত্তিক সেবার প্রতিষ্ঠাতা সোফিয়া মাসলিন বলেন, উইল করার জন্য অনেক সম্পদের মালিক হতে হবে—এ ধারণাটি সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি।
তাঁর মতে, কারও সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পেনশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব, পোষা প্রাণী কিংবা শেষকৃত্য সম্পর্কে ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকলেও সেগুলো নিয়ে আগেভাগে ভাবা দরকার।
এরিনের নিজের ক্ষেত্রেও উইল করার চিন্তা প্রথম আসে এক বন্ধুর বাড়ি কেনার পর। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসলিনের উইল সম্পর্কিত আলোচনা তাঁর নজরে আসে।
মাসলিন সেখানে তাঁর এক চাচাতো ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরেছিলেন। ওই ব্যক্তি অল্প বয়সে উইল না করেই মারা যান। এরপর তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
ঘটনাটি এরিনকে নিজের জন্য উইল করার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর নিজের দাদির উইলও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল।

এরিন জানান, তাঁর দাদি মারা যাওয়ার সময় একটি উইল রেখে গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক হওয়ায় সেটি বেশ জটিল ছিল। কিন্তু সেখানে প্রত্যেকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে লেখা থাকায় পরিবারের ওপর অনেক চাপ কমে গিয়েছিল।
উইল তৈরির সময় এরিন আরও বুঝতে পারেন, নিজের কাছে থাকা আর্থিক সম্পদের পরিমাণ তিনি যতটা ভাবতেন, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে বিশেষ ধরনের সঞ্চয়পত্রও ছিল।
কম সম্পদ থাকলেও উইল কাজে লাগে
আইনজীবী এলিনর হজসনের মতে, কারও সম্পদ খুব বেশি না থাকলেও উইল তৈরির বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ শুধু সম্পদ বণ্টনের বিষয়ই নয়, মৃত্যুর পর ব্যাংক হিসাব, ঋণ বা অন্যান্য আর্থিক বিষয়ও কাউকে সামলাতে হয়। উইলের মাধ্যমে এমন একজনকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায়, যিনি আইনগতভাবে এসব বিষয় পরিচালনা করতে পারবেন। এতে পরিবারের সদস্যদের অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমে।
তাঁর মতে, উইল না থাকার কারণে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারেন না যতক্ষণ না সেই পরিস্থিতি বাস্তবে সামনে আসে।
সোফিয়া মাসলিন বলেন, তরুণদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, উইল করার সময় এখনও আসেনি। পরে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এটি করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনের যেকোনো পর্যায়েই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে।
উইলে শুধু টাকার হিসাবই থাকে না
এরিনের কাছে তাঁর উইলের গুরুত্ব শুধু অর্থ বা সম্পদের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু বিষয় আর্থিক মূল্যের তুলনায় তাঁর কাছে আবেগের দিক থেকে অনেক বেশি মূল্যবান।
তিনি উইলে পরিবারের সদস্যদের জন্য ছোট ছোট কিছু ইচ্ছাও লিখে রেখেছেন। এমনকি তাঁর শেষকৃত্যে কোন কবিতা পাঠ করা হবে এবং অতিথিদের কী পানীয় পরিবেশন করা হবে—সেসব বিষয়ও তিনি উল্লেখ করেছেন।
এসব বিষয় নিয়ে ভাবাকে তাঁর কাছে মোটেও অশুভ বা মৃত্যুভয়কেন্দ্রিক মনে হয়নি।
এরিনের ভাষায়, উইল লেখা তাঁর কাছে সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটবে—এমন প্রত্যাশা নয়। বরং এটি ছিল নিজের দায়িত্ব নেওয়া এবং প্রিয় মানুষগুলোর জীবনকে কিছুটা সহজ করে যাওয়ার একটি উপায়।
কীভাবে উইল তৈরি করা যায়

অনেকের কাছে উইল লেখা কঠিন এবং ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। তবে বিনা খরচে বা তুলনামূলক কম খরচে উইল তৈরির সুযোগও রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে প্রতি বছরের নভেম্বর মাসে একটি দাতব্য উদ্যোগ স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করে। তাঁরা নির্দিষ্ট ধরনের সাধারণ উইল তৈরির জন্য নিজেদের পারিশ্রমিক নেন না।
আইনজীবীর সহায়তায় উইল তৈরির সময় প্রথমেই ঠিক করতে হয়, মৃত্যুর পর নিজের অর্থ ও সম্পদ কারা পাবেন। পরিবার, বন্ধু কিংবা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান—যে কাউকেই উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্ধারণ করা যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে তাঁদের দেখভালের জন্য অভিভাবকের নামও নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এরপর একজন নির্বাহক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচন করতে হয়। মৃত্যুর পর উইলে লেখা ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব থাকে তাঁর ওপর। এই ব্যক্তি পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য কিংবা আইনজীবীও হতে পারেন। তবে আইনজীবীকে দায়িত্ব দিলে তাঁর কোনো পারিশ্রমিক লাগবে কি না, তা আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
পোষা প্রাণী থাকলে মৃত্যুর পর কে সেগুলোর দেখাশোনা করবেন, সেটিও উইলে উল্লেখ করা যায়।
শেষকৃত্য সম্পর্কেও নিজের ইচ্ছা লিখে রাখা সম্ভব। দাফন না দাহ—কোনটি চান, কী ধরনের গান বা পাঠ থাকবে, এমনকি ফুলের বিষয়ে পছন্দও সেখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
সবশেষে উইলটি নিরাপদ জায়গায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি এমন কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানিয়ে রাখা উচিত, যিনি প্রয়োজনের সময় সেটি কোথায় আছে তা খুঁজে বের করতে পারবেন। উইল খুঁজে না পাওয়া গেলে আইনি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে এবং মৃত্যুর পর ব্যক্তির ইচ্ছাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।
২৭ বছর বয়সে এরিন অ্যাটকিনসনের উইল লেখা তাই শুধু সম্পদ ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর কাছে এটি ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট করে রাখা এবং প্রিয়জনদের জন্য সম্ভাব্য জটিলতা কমিয়ে যাওয়ার একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















