যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখন একই সঙ্গে দুটি বড় লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে। একদিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে হরমুজ প্রণালি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ চলছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের উদ্যোগকে ঘিরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ে একের পর এক কর্মকর্তা সরে যাচ্ছেন বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বেসামরিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের একজন ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেন।
ঘটনাগুলো এখন এমন কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কি একই সময়ে এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে? এর ফলে কি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে? আর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ রদবদল কি দেশটির বিস্তৃত সামরিক জোটব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে?
ড্যান ড্রিসকলের পদত্যাগে পেন্টাগনে নতুন প্রশ্ন
গত সোমবার পেন্টাগনে হঠাৎ বড় খবর আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের তো বটেই, দেশটির সাধারণ মানুষের কাছেও ড্রিসকল খুব পরিচিত নাম নন। কিন্তু তাঁর পদত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরে চলা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সর্বশেষ ঘটনা।
সামরিক সংস্কারের ধরন ও গতি নিয়ে ড্রিসকলের সঙ্গে হেগসেথের একাধিকবার মতবিরোধ হয়েছিল। তাঁর চলে যাওয়া এমন এক সময়ে ঘটল, যখন হেগসেথ এরই মধ্যে সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন কিংবা তাঁদের প্রভাব সীমিত করেছেন।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কতটা বেড়েছে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের বক্তব্যে। ট্রাম্পের সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই সিনেটর হেগসেথকে বরখাস্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দেশের জন্য কাজ করা সাহসী নারী-পুরুষদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এর আগে কখনো এতটা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা দেখেননি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এইচ আর ম্যাকমাস্টারও ড্রিসকলের পদত্যাগকে ভালো খবর হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, ড্রিসকল সেনাবাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধের উপযোগী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিকায়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছিলেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা
ড্রিসকলের পদত্যাগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও আধুনিকায়ন নিয়ে গভীর মতবিরোধ ছিল।
ড্রিসকল দ্রুত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে চালকবিহীন আকাশযান যুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধ তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামের চালকবিহীন আকাশযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
হেগসেথ নিজেও সামরিক আধুনিকায়নের একটি বড় পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরে পরিকল্পনার বাস্তবায়নের গতি নিয়ে ড্রিসকলসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়।
ড্রিসকল প্রশাসনের ভেতরে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও রূপান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান। ড্রিসকলের অভিযোগ ছিল, যেসব জেনারেল আধুনিকায়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিতে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সরিয়ে দিয়ে হেগসেথ সেই প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছেন।
অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও সাবেক হোয়াইট হাউস প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা জন ডাফির মতে, ড্রিসকলের পদত্যাগ এমন এক সময়ে সামরিক নেতৃত্বের কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সচিব, সেনাপ্রধান এবং আধুনিকায়ন এগিয়ে নেওয়া অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা চলে গেলে নেতৃত্বে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং চলমান কর্মসূচির গতি ব্যাহত হয়। নেতৃত্বের এই অনিশ্চয়তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর কার্যক্ষমতার ওপরও পড়ে।
সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই হেগসেথের বড় লক্ষ্য
সাবেক সেনা সদস্য এবং টেলিভিশন উপস্থাপক হেগসেথ প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ওপরই বেশি জোর দিয়ে আসছেন।
তিনি তথাকথিত অতিরিক্ত উদারপন্থী নীতিমালা বাতিলের কথা বলেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের প্রাণঘাতী সক্ষমতা কমিয়ে দেয়—এমন কিছু নিয়মকে তিনি অপ্রয়োজনীয় বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বৈচিত্র্যভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি বাতিল করেছেন, দাড়ি রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন এবং পেন্টাগনের করিডরে অতিরিক্ত ওজনের জেনারেলদের দেখা যাচ্ছে—এমন মন্তব্যও করেছেন।
তাঁর আমলে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তাদের অনেককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা তাঁদের প্রভাব কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত দুই ডজন জেনারেল, অ্যাডমিরাল ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাকেও পদ থেকে সরানো হয়েছে কিংবা তাঁদের দায়িত্ব সীমিত করা হয়েছে।
এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত সম্মানিত ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার বিস্তারিত কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
চীনের সামরিক শুদ্ধি অভিযানের সঙ্গে তুলনা
হেগসেথের এই ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে সমালোচকদের কেউ কেউ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামরিক বাহিনীতে চালানো রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের সঙ্গে তুলনা করছেন।
চীনা সামরিক বাহিনীতে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার ফলে নেতৃত্বের কাঠামো ও যুদ্ধপ্রস্তুতিতে গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল শিফার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও সামরিক নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং এর বাস্তব প্রভাব পড়তে পারে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ওপর।
তাঁর মতে, হেগসেথ যেভাবে শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত বদলে দিচ্ছেন, তাতে অনেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই ঝুঁকি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার সুস্পষ্ট পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
হেগসেথের পাশে ট্রাম্প প্রশাসন
তবে হেগসেথের সমর্থকেরা বলছেন, এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয়।
উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে ড্রিসকলের পদত্যাগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হেগসেথের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীতে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি হেগসেথের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে একমত।
ভ্যান্সের অভিযোগ, গত চার দশকে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক দুঃসাহসিকতায় জড়িয়ে পড়েছে। হেগসেথের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে আবার যোদ্ধার মানসিকতা ফিরিয়ে আনা।
হোয়াইট হাউসও হেগসেথের প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর সাফল্যই প্রতিরক্ষা বিভাগের সক্ষমতার প্রমাণ।
ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন বিতর্কের সময় হেগসেথকে সমর্থন করেছেন। এমনকি গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে নিজের অন্যতম সেরা কর্মকর্তাদের একজন বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সাবেক প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী এজরা কোহেনও হেগসেথের সংস্কারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, এতে নতুন চিন্তাভাবনা এবং আরও সক্রিয় ও আগ্রাসী মনোভাব সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।
তবে সামরিক নেতৃত্বের ভেতরের বিরোধ এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ—দুই বিষয় একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
ইউরোপে বাড়ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি
ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের নির্দেশের পর কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের বড় ধরনের বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাস হয়েছে।
ইউরোপ ও এশিয়ায় মজুত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একটি অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের কারণে কমে যাওয়া মজুত পূরণ করা।
এর প্রভাব ইউরোপেও পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জার্মানিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ লিয়ানা ফিক্সের মতে, ইরানে হামলার আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ করেনি। এর ফলে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং ইউরোপ থেকে কিছু মার্কিন সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার যে কৌশল আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল, তা আরও দ্রুত বাস্তবায়িত হয়েছে।
ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের যথেষ্ট সহযোগিতা না করার অভিযোগও করেছেন।
ফিক্সের মতে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে সশস্ত্র চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডসহ তথাকথিত পরোক্ষ হামলা বাড়ছে। রাশিয়া অবশ্য এসব হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে।
ফিক্স বলেন, পুতিন এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে আগের মতো ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দেখছেন না। তাঁর চোখে ইউরোপ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সেখানে নিরাপত্তার কিছু ফাঁক তৈরি হয়েছে।
গত মাসে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করেন, যা ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। তিনি রুশ নেতৃত্বকে ন্যাটোর দৃঢ়তা পরীক্ষা না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে জানা যায়।
অন্যদিকে হেগসেথের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন এলব্রিজ কলবি ইউরোপ সফর করে দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমছে
ওয়াশিংটন জার্মানিতে থাকা প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনার মধ্যে ৫ হাজার কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
একই সঙ্গে জার্মানিতে দূরপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের জন্য আগের প্রশাসনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হচ্ছে।
ইউরোপ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর এই প্রবণতা অবশ্য শুধু ইরান যুদ্ধের কারণে শুরু হয়নি। এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও রয়েছে।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপ থেকে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া যেমন দ্রুত হয়েছে, তেমনি এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়েনি।
বরং সেখান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগর থেকেও যুদ্ধজাহাজ সরানো হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলোর একটি অংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে উপসাগরে পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে ছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং পরে জাপানে অবস্থানরত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন।
অর্থাৎ চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ইরান যুদ্ধের কারণে সেই অঞ্চল থেকেও সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে হয়েছে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক শক্তি একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব—সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতেও বড় চাপ
দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুতেও বড় চাপ তৈরি করেছে বলে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
একটি মার্কিন কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মজুত থাকা প্রায় ৩ হাজার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিমান প্রতিরক্ষার গোলাবারুদের ওপর চাপ আরও বেশি।
প্রায় ২ হাজার ৩০০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবহার করা হয়েছে বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়।
তবে হোয়াইট হাউস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান মুখপাত্র আনা কেলির দাবি, দেশটির সামরিক বাহিনীর কাছে প্রেসিডেন্টের সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে।

ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়েছে—দাবি সমর্থকদের
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এজরা কোহেনের মতে, সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের প্রচলিত সামরিক হুমকি অনেকটাই কমে গেছে।
তাঁর দাবি, ইরানের মিত্র ও প্রক্সি সংগঠনগুলোও আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কিছু এলাকায় তারা কার্যত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখন ইরানের আরও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর অতিরিক্ত সুযোগ ও সামরিক শক্তি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এমনকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও ভবিষ্যতে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েনের শেষ কোথায়?
তবে যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ এখনো অনিশ্চিত।
ছয় মাসেরও বেশি সময় আগে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের সদস্যরাও রয়েছেন।
এখন সেই মোতায়েন ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাঁদের কবে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, তার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নোঙর করার ছবি প্রকাশ পায়। উপসাগরীয় অঞ্চলে টানা প্রায় নয় মাসের কঠিন দায়িত্ব পালনের পর জাহাজটির গায়ে মরিচার দাগ দেখা যাচ্ছিল।
ইরান এই ছবিকে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দাবি করেছে, দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
হেগসেথ অবশ্য জাহাজটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ—এমন দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবু এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রচারযুদ্ধই দেখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের পাশাপাশি পেন্টাগনের ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে।
একদিকে হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে নতুনভাবে সাজাতে চাইছেন, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ সেনা, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম। এর সঙ্গে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও বজায় রাখতে হচ্ছে।
ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পেন্টাগনের এই দ্রুত রদবদল কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব সরিয়ে দিয়ে নতুন ধরনের দুর্বলতা তৈরি করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















