ইংল্যান্ডে সরকারি পরিসংখ্যানের আড়ালে থেকে যাচ্ছে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী, যারা কার্যত শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন। নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে কলেজে পড়াশোনা করছে বলে তালিকাভুক্ত থাকলেও তাদের একটি বড় অংশ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
ইংল্যান্ডের শিশু কমিশনার ডেম র্যাচেল দে সুজা জানিয়েছেন, ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৪২ হাজার তরুণ-তরুণী সরকারি হিসাবে কলেজে পড়ছে বলে দেখানো হলেও তারা অন্তত অর্ধেক শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হচ্ছে না।
তার ভাষায়, এসব তরুণ-তরুণী যেন সরকারি নজরদারির বাইরে চলে গেছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তাও পাচ্ছে না।
কলেজে উপস্থিতির তথ্যই নেই সরকারি হিসাবে
ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়গুলোর মতো উচ্চশিক্ষাপূর্ব কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির তথ্য সংগ্রহ বা সরকারকে জানানো বাধ্যতামূলক নয়। এ কারণে কলেজে ভর্তি থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারা নিয়মিত পড়াশোনা করছে এবং কারা দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত—তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সরকারের হাতে নেই।

শিশু কমিশনারের প্রতিবেদনে ইংল্যান্ডের ২৬২টি কলেজ গোষ্ঠীর কাছ থেকে পাওয়া উপস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের তুলনায় কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ডে কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়মিত অনুপস্থিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে দেখা যায়, ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের প্রায় ৫২ দশমিক ২ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ তারা কলেজের অন্তত ১০ শতাংশ পাঠে উপস্থিত হচ্ছে না।
আর প্রায় ৪২ হাজার শিক্ষার্থী, অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, অতি মাত্রায় অনুপস্থিত। তারা কলেজের অন্তত অর্ধেক পাঠে যোগ দিচ্ছে না।
শিক্ষা ও কাজ—দুটির বাইরে আরও বড় একটি গোষ্ঠী
সরকারি হিসাবে ইংল্যান্ডে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৫৭ হাজার তরুণ-তরুণী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের কোনোটিতেই নেই।
তবে শিশু কমিশনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজে ভর্তি থাকার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিত এসব শিক্ষার্থীকেও কার্যত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা তরুণদের গোষ্ঠীর সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। প্রতিবেদনে এদের ‘লুকানো’ বা সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা তরুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেম র্যাচেল বলেন, কলেজে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিত থাকার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। কেউ খণ্ডকালীন কাজ করছে, কেউ যাতায়াতের খরচ বহন করতে পারছে না। আবার কেউ কেউ করোনা মহামারির সময়ের পর থেকেই প্রায় পুরোপুরি শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তার মতে, খণ্ডকালীন চাকরি করা শিক্ষার্থীরা হয়তো মাঝেমধ্যে কলেজে অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু যারা দীর্ঘ সময় ধরে কলেজে যাচ্ছে না, তাদের অনেকেই অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চাপ বড় কারণ
ইংল্যান্ডের বোল্টন কলেজের অধ্যক্ষ লিয়াম স্লোয়ান বলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী অর্ধেকের বেশি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে না। তবে যারা দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকে, তাদের অনেকেরই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা রয়েছে অথবা তারা খণ্ডকালীন চাকরি করে।

তার মতে, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তাৎক্ষণিকভাবে একটি স্বল্পমেয়াদি কাজ করে কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগ ভবিষ্যতে কয়েক মাস পর পাওয়া একটি শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে।
বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের পাঠে উপস্থিতির সমস্যা বেশি দেখা যায়। ইংল্যান্ডে যেসব শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট মানের পরীক্ষার ফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এসব বিষয়ও পড়তে হয়।
তবে বোল্টন কলেজে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপস্থিতির হার কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে জানান স্লোয়ান। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কলেজে আসতে উৎসাহিত করতে পূর্ণকালীন কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে। তারা প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান এবং কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সরকারের প্রতি একাধিক সুপারিশ
শিশু কমিশনার আশা করছেন, সরকার তার প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
এর মধ্যে রয়েছে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা এবং উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কলেজগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দল দ্রুত চালু করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে বাসযাত্রার ব্যবস্থা করার সুপারিশও করা হয়েছে।
হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে একটি প্রজন্ম
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতি আটজনের মধ্যে প্রায় একজন বর্তমানে শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে সাবেক মন্ত্রী অ্যালান মিলবার্নের নেতৃত্বে প্রকাশিত একটি বড় প্রতিবেদনের প্রথম অংশে সতর্ক করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা প্রতি ছয়জনে একজন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনে দেশটি একটি ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের’ ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ‘লুকানো’ তরুণদের সংজ্ঞা নিয়ে দুটি প্রতিবেদনের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। শিশু কমিশনারের প্রতিবেদনে কলেজে ভর্তি থাকলেও দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের এভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে মিলবার্নের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা এবং একই সঙ্গে সরকারি ভাতা না নেওয়া তরুণদের ‘লুকানো’ গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে তাদের কাছে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কলেজগুলোর অর্থসংকটও বড় বাধা
কলেজগুলোর সংগঠনের শিক্ষা নীতিবিষয়ক পরিচালক ক্যাথ সেজেন বলেন, প্রতিবেদনের অনেক সুপারিশের সঙ্গে তারা একমত। তবে অর্থসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কলেজগুলো সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, কলেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি বিনিয়োগ, বিভিন্ন সহায়তা সেবার মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক জোরদারে একটি শক্তিশালী জাতীয় কৌশলের দাবি জানিয়ে আসছে।
শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, শিক্ষা, চাকরি ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ সংস্কারে আরও শিক্ষার্থীর জন্য পরবর্তী ধাপের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকার আরও জানিয়েছে, ইংরেজি ও গণিতের পরীক্ষায় বারবার অকৃতকার্য হয়ে একই পরীক্ষা পুনরায় দেওয়ার যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তা কমাতে নতুন ধরনের মধ্যবর্তী যোগ্যতা চালু করা হবে। পাশাপাশি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দল দ্রুত চালুর উদ্যোগও নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, কলেজে ভর্তি থাকলেই একজন তরুণ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত—এমন ধারণা যে বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না, নতুন এই প্রতিবেদন সেটিই সামনে এনেছে। সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা না দিলে তাদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















