০৮:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, লোহিত সাগর নিয়ে নতুন চাপে যুক্তরাষ্ট্র মোদি-শি বৈঠকে সীমান্ত শান্তির বার্তা, ‘মতপার্থক্য যেন বিরোধে না গড়ায়’ ইউরোপে ইসলাম নয়, ইসলামপন্থা আর ভীতিই আসল সংকট আর্জেন্টিনায় মিলেইর অর্থনৈতিক সাফল্য, তবু বাড়ছে জনরোষ ভারতের বাজারে দ্রুত বাড়ছে পনিরের চাহিদা, বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস সরকারের সমালোচনা করার অধিকারই গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা মিয়ানমারে ফিরে এসেছে আফিম চাষ, বাড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগ চীনা গবেষকদের কাছে আজও এক ধাঁধার নাম ভারত জাপানিদের জন্য ভিসা ফি সাত গুণ বাড়াল চীন লেটুসবাহিত পরজীবীর প্রকোপ শেষের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে

মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক চাপের মাঝে ফেডের সামনে সুদ বাড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পার হয়নি কেভিন ওয়ারশের। কিন্তু আগামী ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকেই তাকে নিতে হতে পারে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। অর্থনীতির অবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা—সবকিছু মিলিয়ে এবারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিশ্চয়তাও অনেক বেশি।

বাজারে এখন ফেডের সুদের হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা প্রায় সমান বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি হতে পারে একেবারেই শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ের মতো। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুই দিক বিবেচনায় সুদের হার বাড়ানোই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে দ্য ইকোনমিস্ট।

এর প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দিয়ে যে মূল মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়, সেটিও লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি ও অন্যান্য কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

অবশ্য মূল্যস্ফীতি যে সবদিক থেকেই দ্রুত বাড়ছে, এমন নয়। দ্য ইকোনমিস্টের নিজস্ব উন্নত পূর্বাভাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি সূচক লক্ষ্যমাত্রার সামান্য ওপরে থাকলেও সেটি কমছে। মজুরি বৃদ্ধির হারও আগের তুলনায় কমেছে। ফলে শুল্ক বৃদ্ধি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে দামে যে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে, সেগুলো ধীরে ধীরে কমে গেলে মূল্যস্ফীতিও নিজে থেকেই নেমে আসতে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যবৃদ্ধির হার ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থেকেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে কম করে দেখার চেয়ে কিছুটা বেশি সতর্ক থাকা নিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী। বেকারত্বের হার মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ। চাকরির শূন্যপদও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগস্টে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির হার ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত বাস্তব চিত্র তার বিপরীত। এআই খাত আপাতত সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান ধ্বংসের বদলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রচলিত যেকোনো নীতিগত হিসাব অনুযায়ী বর্তমান সুদের হার আরও বেশি হওয়া উচিত বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আর্থিক বাজারের অবস্থাও অর্থনীতিতে অতিরিক্ত উত্তাপের ঝুঁকি কম নয় বলে দেখাচ্ছে। ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে, শেয়ারবাজার বেশ চাঙা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদও প্রবল। বন্ডবাজার কিছুটা অস্থির হলেও তার একটি কারণ হলো—বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সুদের হার বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে বলে বাজারের ধারণা। সুদের হার বাড়লে সাধারণত বন্ডের দাম কমে যায়।

তবে ফেডের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি এখন অর্থনীতি নয়, রাজনীতিও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ফেডের ওপর সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে তা বাজারে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে প্রেসিডেন্টই ফেডের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছেন।Federal Reserve Faces Tough Decision on Rate Increase - WSJ

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের প্রশংসা করার পাশাপাশি ফেড সুদের হার না কমালে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ফেডের ওপর তার হস্তক্ষেপ নতুন নয়। তবে এর পাশাপাশি ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বেসেন্টের নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার একটি অপ্রত্যাশিত উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার সাময়িকভাবে কিছুটা কমিয়ে দেয়। এর একটি ব্যাখ্যা হলো, কম দামে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণ কিনে বেসেন্ট হয়তো দক্ষতার সঙ্গে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা করেছেন। অন্য ব্যাখ্যা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে থেকেই তিনি এক ধরনের মুদ্রানীতি শিথিল করার ব্যবস্থা করেছেন।

এর মধ্যেই কেভিন ওয়ারশের নিজের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে অনীহা ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জুলাইয়ে তাকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল যে ফেড আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ২ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি মূল্যস্ফীতি মেনে নেওয়ার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেনি।

এরপর অবশ্য ২৮ আগস্ট জ্যাকসন হোলে দেওয়া এক বক্তব্যে ওয়ারশ তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন। জ্যাকসন হোলের বার্ষিক সম্মেলনটি ফেডের মুদ্রানীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি জায়গা হিসেবে পরিচিত। সেখানে তার বক্তব্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিন্তু ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের মধ্যে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে যদি ওয়ারশ হঠাৎ নরম অবস্থান নেন, তাহলে তার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ফেড চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টের ওপর নির্ভরশীল এবং দায়িত্ব পাওয়ার সময় ট্রাম্পের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখিয়েছিলেন। ফলে সেপ্টেম্বরের সুদের হার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত এখন ওয়ারশের জন্য নিজের অবস্থান ও স্বাধীনতা প্রমাণের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ফেডের সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যগুলোর একটি হলো ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে—এমন তথ্য এলেও ওয়ারশের জন্য রাজনৈতিক ও নীতিগত পরীক্ষাটি শেষ হবে না।

কারণ ওয়ারশ তার পূর্বসূরির অতিরিক্ত ‘তথ্যনির্ভর’ নীতির সমালোচনা করেছিলেন। অর্থাৎ একেকটি অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে বারবার সুদের হার পরিবর্তনের প্রবণতার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এখন নিজেই যদি একটি মাত্র মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটিকে হোয়াইট হাউসের চাপের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখা হতে পারে।

এ কারণেই পরিস্থিতিটি অনেকটা উল্টো যুক্তির জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প যত বেশি সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দেবেন, ফেডের সুদের হার বাড়ানোর যুক্তিও তত বেশি শক্তিশালী হবে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানগত বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারের আস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থা, লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং ফেডের স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে কেভিন ওয়ারশের সামনে সুদের হার বাড়ানোই এখন সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ। সেপ্টেম্বরের বৈঠকে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য নয়, তার নিজের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, লোহিত সাগর নিয়ে নতুন চাপে যুক্তরাষ্ট্র

মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক চাপের মাঝে ফেডের সামনে সুদ বাড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত

০৭:১৯:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পার হয়নি কেভিন ওয়ারশের। কিন্তু আগামী ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকেই তাকে নিতে হতে পারে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। অর্থনীতির অবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা—সবকিছু মিলিয়ে এবারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিশ্চয়তাও অনেক বেশি।

বাজারে এখন ফেডের সুদের হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা প্রায় সমান বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি হতে পারে একেবারেই শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ের মতো। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুই দিক বিবেচনায় সুদের হার বাড়ানোই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে দ্য ইকোনমিস্ট।

এর প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দিয়ে যে মূল মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়, সেটিও লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি ও অন্যান্য কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

অবশ্য মূল্যস্ফীতি যে সবদিক থেকেই দ্রুত বাড়ছে, এমন নয়। দ্য ইকোনমিস্টের নিজস্ব উন্নত পূর্বাভাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি সূচক লক্ষ্যমাত্রার সামান্য ওপরে থাকলেও সেটি কমছে। মজুরি বৃদ্ধির হারও আগের তুলনায় কমেছে। ফলে শুল্ক বৃদ্ধি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে দামে যে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে, সেগুলো ধীরে ধীরে কমে গেলে মূল্যস্ফীতিও নিজে থেকেই নেমে আসতে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যবৃদ্ধির হার ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থেকেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে কম করে দেখার চেয়ে কিছুটা বেশি সতর্ক থাকা নিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী। বেকারত্বের হার মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ। চাকরির শূন্যপদও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগস্টে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির হার ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত বাস্তব চিত্র তার বিপরীত। এআই খাত আপাতত সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান ধ্বংসের বদলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রচলিত যেকোনো নীতিগত হিসাব অনুযায়ী বর্তমান সুদের হার আরও বেশি হওয়া উচিত বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আর্থিক বাজারের অবস্থাও অর্থনীতিতে অতিরিক্ত উত্তাপের ঝুঁকি কম নয় বলে দেখাচ্ছে। ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে, শেয়ারবাজার বেশ চাঙা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদও প্রবল। বন্ডবাজার কিছুটা অস্থির হলেও তার একটি কারণ হলো—বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সুদের হার বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে বলে বাজারের ধারণা। সুদের হার বাড়লে সাধারণত বন্ডের দাম কমে যায়।

তবে ফেডের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি এখন অর্থনীতি নয়, রাজনীতিও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ফেডের ওপর সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে তা বাজারে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে প্রেসিডেন্টই ফেডের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছেন।Federal Reserve Faces Tough Decision on Rate Increase - WSJ

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের প্রশংসা করার পাশাপাশি ফেড সুদের হার না কমালে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ফেডের ওপর তার হস্তক্ষেপ নতুন নয়। তবে এর পাশাপাশি ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বেসেন্টের নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার একটি অপ্রত্যাশিত উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার সাময়িকভাবে কিছুটা কমিয়ে দেয়। এর একটি ব্যাখ্যা হলো, কম দামে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণ কিনে বেসেন্ট হয়তো দক্ষতার সঙ্গে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা করেছেন। অন্য ব্যাখ্যা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে থেকেই তিনি এক ধরনের মুদ্রানীতি শিথিল করার ব্যবস্থা করেছেন।

এর মধ্যেই কেভিন ওয়ারশের নিজের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে অনীহা ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জুলাইয়ে তাকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল যে ফেড আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ২ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি মূল্যস্ফীতি মেনে নেওয়ার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেনি।

এরপর অবশ্য ২৮ আগস্ট জ্যাকসন হোলে দেওয়া এক বক্তব্যে ওয়ারশ তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন। জ্যাকসন হোলের বার্ষিক সম্মেলনটি ফেডের মুদ্রানীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি জায়গা হিসেবে পরিচিত। সেখানে তার বক্তব্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিন্তু ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের মধ্যে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে যদি ওয়ারশ হঠাৎ নরম অবস্থান নেন, তাহলে তার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ফেড চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টের ওপর নির্ভরশীল এবং দায়িত্ব পাওয়ার সময় ট্রাম্পের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখিয়েছিলেন। ফলে সেপ্টেম্বরের সুদের হার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত এখন ওয়ারশের জন্য নিজের অবস্থান ও স্বাধীনতা প্রমাণের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ফেডের সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যগুলোর একটি হলো ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে—এমন তথ্য এলেও ওয়ারশের জন্য রাজনৈতিক ও নীতিগত পরীক্ষাটি শেষ হবে না।

কারণ ওয়ারশ তার পূর্বসূরির অতিরিক্ত ‘তথ্যনির্ভর’ নীতির সমালোচনা করেছিলেন। অর্থাৎ একেকটি অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে বারবার সুদের হার পরিবর্তনের প্রবণতার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এখন নিজেই যদি একটি মাত্র মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটিকে হোয়াইট হাউসের চাপের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখা হতে পারে।

এ কারণেই পরিস্থিতিটি অনেকটা উল্টো যুক্তির জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প যত বেশি সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দেবেন, ফেডের সুদের হার বাড়ানোর যুক্তিও তত বেশি শক্তিশালী হবে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানগত বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারের আস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থা, লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং ফেডের স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে কেভিন ওয়ারশের সামনে সুদের হার বাড়ানোই এখন সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ। সেপ্টেম্বরের বৈঠকে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য নয়, তার নিজের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।