রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুক্রবার রাজধানী ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে এক সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
কবির বলেন, দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতির অবসান কেবল রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ এককভাবে ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত বারো লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংকট সমাধান করতে পারবে না। এ জন্য আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে চীন এবং সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যাবাসনই অগ্রাধিকার
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সম্মেলনে তিনটি প্রধান প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো আরাকান রাজ্যে চলমান সামরিক অস্থিরতা, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং সীমান্ত দিয়ে নতুন শরণার্থীর ক্রমাগত অনুপ্রবেশ। তিনি জানান, প্রত্যাবাসন এখনও ঢাকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথাও উঠে আসে আলোচনায়। এর আগে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে দুই দফায় সফল প্রত্যাবাসন হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
নতুন কৌশল প্রণয়ন কমিটি
রোহিঙ্গা বিষয়ে জাতীয় কৌশল প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ফরেন সার্ভিস একাডেমি এবং ইউএনএইচসিআরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনের শিরোনাম ছিল দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট, একটি সামগ্রিক সমাধানের অন্বেষণ।
চীনের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর চীনের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। রাখাইনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ থাকায় বেইজিং এতদিন রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গেছে। ঢাকার নতুন উদ্যোগে চীনকে সরাসরি টেবিলে আনার চেষ্টা এই সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। বেইজিংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ করেই মিয়ানমার সরকারকে আলোচনার টেবিলে আনার কৌশল নিচ্ছে ঢাকা, যা এতদিনের দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার তুলনায় ভিন্ন পথ।
দীর্ঘায়িত সংকটের বাস্তবতা
২০১৭ সালে সামরিক দমন-পীড়নের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নয় বছরেও কমেনি, বরং আরাকান রাজ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে নতুন অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে বলে ত্রাণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমাধানের বাইরে কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
আগামী দিনের পথরেখা
ত্রিপক্ষীয় আলোচনার নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, চীন কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিতে রাজি হবে এবং মিয়ানমারের ভেতরে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের মধ্যকার বিরোধ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে। আগামী দিনে এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার কাঠামো ও সময়সূচি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকট একটি জটিল সমীকরণ হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, চীন, ভারত ও পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর স্বার্থ পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার নতুন এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে তা কেবল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পথ খুলবে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















