বিশ্ব যখন ইউরোপের যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটছে, তখন চীনকে কেউ কেউ সবচেয়ে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বেইজিংয়ের ক্ষমতার অলিন্দে শুরু হয়েছে এমন এক শুদ্ধি অভিযান, যা শুধু চীনের ভেতরের রাজনীতিকেই নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা হিসাবকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
চীনের সামরিক শীর্ষে নজিরবিহীন তদন্ত
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ দুই জেনারেলের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তদন্ত চলছে। আধুনিক চীনের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর একেবারে শীর্ষ স্তরে এমন ঘটনা বহু দশক ধরে দেখা যায়নি। বিশাল জনবলসম্পন্ন পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্বে এই টালমাটাল পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
দলীয় শুদ্ধি অভিযানের বিস্তার
এই সামরিক অভিযান বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি ও তথাকথিত রাজনৈতিক বিচ্যুতির অভিযোগে বিপুলসংখ্যক দলীয় কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়েছেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখে। ফলে এই শুদ্ধি অভিযান ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চেয়েও বেশি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও, যারা ভয়ে সংস্কারমূলক চিন্তা থেকে সরে যাচ্ছেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছেন।

সামরিক শক্তি কি দুর্বল হচ্ছে
অনেকে মনে করতে পারেন, সামরিক শীর্ষে এমন বিপর্যয় পশ্চিমা বিশ্বের জন্য স্বস্তির খবর। কারণ চীনের নৌবাহিনী ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতাও দ্রুত বাড়ছে। তবে বাস্তবতা আরও জটিল। স্বল্পমেয়াদে এই শুদ্ধি অভিযান সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদে তা বাহিনীকে আরও কঠোর ও দক্ষ করে তুলতেও পারে।
তাইওয়ান প্রশ্নে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করছে তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংকট। চীনের নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব যখন একের পর এক বাদ পড়ছে, তখন সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ কণ্ঠস্বর কমে যাচ্ছে। সমুদ্রপথে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ, তাইওয়ান প্রণালিতে নিয়মিত শক্তি প্রদর্শন এবং বিদেশি নৌ ও বিমান টহলের ভেতর সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
অনুগত নেতৃত্বের সম্ভাব্য মূল্য
শুদ্ধি অভিযানের পর শীর্ষ সামরিক পরিষদে অভিজ্ঞতা সংকট প্রকট। যদি শূন্য পদগুলো কেবল অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে পূরণ করা হয়, তবে তারা কি কঠিন সত্য রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে তুলে ধরতে সাহস পাবেন। তাইওয়ান আক্রমণের মতো সিদ্ধান্তে বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, যা খোলাখুলি বলা না গেলে ভুল হিসাবের সম্ভাবনা বাড়বে।
অনিশ্চিত বিশ্বের অস্বস্তিকর নিশ্চয়তা
চীনের বর্তমান নেতৃত্ব যে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা নিয়ে খুব কম বিশ্লেষকেরই সন্দেহ আছে। আনুগত্যকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া এই শাসনব্যবস্থা বাইরে থেকে যতই স্থিতিশীল মনে হোক, ভেতরের এই কঠোর শুদ্ধি অভিযান বিশ্ব রাজনীতির জন্য কোনো স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। বরং এটি জানিয়ে দিচ্ছে, তথাকথিত নিশ্চিত শক্তির মধ্যেও অনিশ্চয়তার বীজ গভীরভাবে রোপিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








