দশকের পর দশক ধরে জাপানের বিনিয়োগকারীরা দেশের বাইরে বেশি মুনাফার খোঁজে পুঁজি সরিয়েছেন, কারণ দেশের ভেতরে সুদের হার ছিল দীর্ঘদিন ধরে নিচু। তার ফল হিসেবে জাপানের বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অর্থনীতির আকারের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সুদের হার বাড়ছে, আর তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েনের বড় পতন ও ডলারের দুর্বলতা নিয়ে জাপান ও আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি পড়েছে। তবে মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ সমস্যার সমাধান নয়, বরং মূল দুর্বলতাকে আড়াল করার চেষ্টা মাত্র।
ইয়েনের পতন ও ডলারের অস্বস্তি
এই মাসে ইয়েন ডলারের বিপরীতে প্রায় তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমে যায়। এরপর সরকারি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার খবরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বাজারে অনিশ্চয়তা কাটেনি। জানুয়ারির শেষ দিকে ডলারের মূল্য ও হঠাৎ কমে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক বলে মন্তব্য করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই পতন নতুন নয়। ক্ষমতায় আসার পর শুল্কনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ এবং ঋণনির্ভর ব্যয়ের কারণে বিনিয়োগকারীরা ডলারের ঝুঁকি কমাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির অদ্ভুত সমীকরণ
সাধারণত জাপান ও আমেরিকার সুদের হারের পার্থক্য কমলে দুই মুদ্রার ব্যবধানও কমার কথা। বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং জাপানের মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়ে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও বেশি হয়েছে। এতে ইয়েন আরও দুর্বল হওয়ার কথা হলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জাপানের পণ্যমূল্যের তুলনায় ইয়েনের দর অনেক কম। অর্থাৎ বাজারে ইয়েনের মূল্য প্রকৃত শক্তির চেয়ে অনেক নিচে রয়ে গেছে।
আস্থার সংকট ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
এই অস্বাভাবিক দুর্বলতার পেছনে বড় কারণ আস্থার অভাব। জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ এখনও অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে নির্বাচনের আগে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি খাদ্যে ভোগকর স্থগিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু তার অর্থ জোগানের স্পষ্ট পথ নেই। এতে বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
হস্তক্ষেপ নয়, সংকেত হিসেবে মুদ্রা
জাপানের হাতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ থাকলেও কৃত্রিমভাবে ইয়েনকে সমর্থন দিলে সংকটের ঝুঁকি কমবে না। সুদের হার নির্ধারণ, পুঁজির অবাধ চলাচল এবং নির্দিষ্ট বিনিময় হার—এই তিনটি একসঙ্গে টেকসই নয়। ইয়েনকে লক্ষ্যবস্তু না বানিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার সূচক হিসেবে দেখা উচিত।
আমেরিকার জন্যও সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্র যদি মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে নামে, তাহলে তা নীতিনির্ধারণকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। ডলারের চাহিদা কমলে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জন্য পুঁজির খরচ বাড়ে। তাই কেবল বাণিজ্য ঘাটতির ভয় থেকে শক্তিশালী ডলারের নীতি ছেড়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








