স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শনিবার খসড়া জাতীয় মিডিয়া কমিশন অধ্যাদেশ ও ব্রডকাস্টিং কমিশন অধ্যাদেশকে স্বাধীন গণমাধ্যম বিকাশে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে ‘বিদায়ী উপহাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
টিআইবির মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন ও কার্যকর মিডিয়া কমিশন গঠনের দাবি রয়েছে, যা স্বাধীন গণমাধ্যম ও স্বতন্ত্র সম্প্রচার নিশ্চিত করবে। এই দাবির প্রতিফলন মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও ছিল।
মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষিত
টিআইবি জানায়, মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দশ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকার ওই সুপারিশ বাস্তবায়নে সম্পূর্ণভাবে উদাসীন থেকেছে।
বরং মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে সরকার ‘জাতীয় মিডিয়া কমিশন অধ্যাদেশ’ ও ‘ব্রডকাস্টিং কমিশন অধ্যাদেশ’ নামে দুটি খসড়া প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে দুটি নতুন সরকারি সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর অভিযোগ
এই উদ্যোগে টিআইবি গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, জনগণের প্রত্যাশা ও মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বিপরীতে গিয়ে এই খসড়া দুটি প্রণয়ন করা হয়েছে। টিআইবির মতে, এর মূল উদ্দেশ্য গণমাধ্যম খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা।
এছাড়া মাত্র তিন দিনের মধ্যে জনমত আহ্বান করাকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিদায়ী উপহাস বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
গোপনীয়তা ও সংস্কারবিরোধী প্রবণতার সমালোচনা
টিআইবি এই পদক্ষেপকে সরকারের শুরু থেকেই প্রায় সব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখার ধারাবাহিক চর্চার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে কিছু মহলের সংস্কারবিরোধী ও বাধাদানমূলক তৎপরতাকে রাষ্ট্র সংস্কারের আড়ালে পরিচালিত বলেও মন্তব্য করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য
এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত দুই কমিশনের কাঠামো, কমিশনারদের মর্যাদা ও ক্ষমতা, এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে بيرোক্র্যাটিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকে। এটি স্বাধীন গণমাধ্যম ও সম্প্রচারের অঙ্গীকারের প্রতি উপহাস।
তিনি আরও বলেন, যদিও বিষয়টি হতাশাজনক, তবে এতে তারা বিস্মিত নন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষের মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা এবং কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এতে ভূমিকা রেখেছে।
একক ও স্বাধীন মিডিয়া কমিশনের প্রস্তাব
ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিলের সীমাবদ্ধতা এবং সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য অনুরূপ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গবেষণা ও অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে মিডিয়া সংস্কার কমিশন একটি একক, স্বাধীন ও সরকারমুক্ত মিডিয়া কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু সরকার সেই সুপারিশে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুটি আলাদা সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ পরিহার করে গণমাধ্যম ও সম্প্রচার খাতের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন এবং সরকার-নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের আহ্বান জানায় টিআইবি।
খসড়া অধ্যাদেশ জারি না করার আহ্বান
টিআইবি সরকারকে তাড়াহুড়ো করে এই দুটি খসড়া অধ্যাদেশ জারি না করার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবি স্মরণ করিয়ে দেয়, এসব দলের অনেকেই অতীতে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন সম্প্রচারের বাধার শিকার হয়েছে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে।
নতুন সংসদ গঠনের পর অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে
টিআইবির প্রত্যাশা, নতুন সংসদ গঠনের পর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অভিজ্ঞতা, প্রতিশ্রুতি ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ঐক্যবদ্ধ মিডিয়া কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেবে।
এমন একটি কমিশন দেশের গণমাধ্যম ও স্বাধীন সম্প্রচারের বিকাশে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং সর্বোচ্চ পেশাদার মান নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে বলে টিআইবি মনে করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















