১০:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬
পাহাড়ে নীরব প্রত্যাবর্তন: জাবারখেতের বনে বন্যপ্রাণী ও নরম পর্যটনের নতুন পথ হংকংয়ে ইতিহাস গড়ল চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা, তালিকাভুক্তিতেই উঠল বিপুল অর্থ এআই চাহিদার জোয়ারে স্যামসাংয়ের লাভে উল্লম্ফন, এক ত্রৈমাসিকে তিন গুণ সৌদি আরবের শিংওয়ালা মরু সাপ গ্রিনল্যান্ড ঘিরে নতুন কৌশল, বরফ গলার পথে চীনের ছায়া ঠেকাতে ট্রাম্পের তৎপরতা কেরালার কারিগরদের হাতে ফিরল প্রাচীন নৌযানের গৌরব, সমুদ্রে পাড়ি দিল কৌণ্ডিন্য ইউনিক্লোর ঝলমলে বিক্রি, লাভের পূর্বাভাস বাড়াল ফাস্ট রিটেইলিং ঋণের বদলে যুদ্ধবিমান: সৌদি অর্থ সহায়তা রূপ নিতে পারে জেএফ–সতেরো চুক্তিতে গৌর নদী: বরিশালের শিরা-উপশিরায় ভর করে থাকা এক জীবন্ত স্মৃতি আমার মতো আর কারও না হোক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের পুরো-প্যানেল বিজয়— নন-ইনক্লুসিভ জাতীয় নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি কি?

  • স্বদেশ রায়
  • ১১:৫৯:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • 215

তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে বেগম জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত শুধু নয়— দেশের শীর্ষ পত্রিকায় বিড়াল “জেবু কাহিনী” মূল সংবাদ হয়ে ওঠার রেশ না কাটতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আর এ সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবির পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়েছে।

তাই স্বাভাবিকই ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি ছাত্র শিবির যে ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হচ্ছিল তার থেকে একটু আলাদা করে দেখতে হবে  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়টিকে। আর তা খুব বেশি আলাদা যে তা নয়। বরং বলা যেতে পারে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী যে ড্রাইভিং সিটে ছিল, তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা ও বেগম জিয়াকে ঘিরে সকল প্রচেষ্টার পরেও জামায়াত-ই-ইসলামী যে সেই ড্রাইভিং সিটে আছে তারই প্রকাশ এ নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের বিজয়।

৫ আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পরে কিছু সময়ের জন্য সেনাবাহিনী প্রধান দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার ড্রাইভিং সিটে এসেছিলেন। এবং সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

শিবির-সমর্থিত প্যানেলের বড় জয়

কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস যদিও বলেছেন, ৫ আগস্ট তার অ্যামেজিং ম্যাটিকুলাস ডিজাইনড প্লানের রেজাল্ট। তার পরেও তিনি স্বীকার করেছেন, সেনাবাহিনীর সমর্থন না পেলে তারা সফল হতে পারতেন না। এ ক্ষেত্রে অন্তত মুহাম্মদ ইউনূস কোনো অসত্য বলেননি। কারণ দেশের মানুষ এটা দেখেছে।

যাহোক ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা না যেতেই রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ড্রাইভারের সিটে চলে আসে বাংলাদেশে জামায়াত-ই-ইসলামী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে শুধু নয়, জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে এ ধরনের অবস্থানে আসা এটাই প্রথম। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী’র ন্যাচারাল আলাইস বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এতদিন তাদের এই ধারার রাজনীতির ড্রাইভারের সিটটিতে ছিল। জামায়াত-ই-ইসলামী সহযাত্রী ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরে এই সিটটি ও অবস্থান বদল হয়ে গেছে।

আর সিটটি যে বদল হয়ে গেছে তা বিএনপিও তার সিভিল সোসাইটির মিত্ররা বুঝতে পেরেছে। যে কারণে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের সকল সংস্কার মেনে নিয়ে, এমনকি জুলাই চার্টারে সই করেও অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। সর্বশেষ তারা একদিকে যেমন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মিত্র পরিবর্তন করে বা কিছুটা মুখ পরিবর্তন করে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে এই ড্রাইভারে সিটটি দখল করার চেষ্টা করছে।

কিন্তু দুই শিবিরে বিভক্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শিবিরের সমর্থনের বলে বিএনপি এতদিন জামায়াত ইসলামীকে পার্শ্ব চরিত্র রেখে নিজে মূল চরিত্র বা নায়কের ভূমিকায় ছিল— ওই শিবিরের নায়ক বা মূল চরিত্র ৫ আগস্টের পরে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত-ই-ইসলামী দখল করেছে। এখানে দখল শব্দটি বাস্তবে খুব সঠিক প্রয়োগ নয়। ব্যবহার করতে হচ্ছে এ কারণে যে জামায়াত-ই-ইসলামী যে এই ড্রাইভারের আসনটি পেয়েছে তা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়— একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে, আর যে ঘটনায় পুলিশ, র‍্যাব, সামরিক বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র ক্যাডার ও সাধারণ মানুষের রক্তপাত ঘটেছে।

তবে এর পরেও বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সমর্থক শক্তির অনুপস্থিতি ও নিশ্চুপতায় এটাই অবধারিত ছিল।

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সেখানে না গিয়ে শুধু বলা যায়— বিএনপি ও জামায়াত-ই-ইসলামী মিলিতভাবে এতদিন যে রাজনীতি করে এসেছে ওই রাজনীতির মৌল অংশের মালিকানা জামায়াত-ই-ইসলামীর। ওই মৌল অংশটুকু অনেক কঠিন। ওই কঠিন অংশের শরীরে অনেকগুলো সফট আস্তরণ লাগিয়ে বিএনপি এগিয়ে চলেছে— মূল ভূমিকায় থেকে। আর জামায়াত-ই-ইসলামী অপেক্ষা করেছে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাপের সমাজ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনের জন্য।

জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে জামায়াতের ভূমি তৈরির একটা জায়গা ছিল। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রত্যক্ষ ভূমি তৈরির জায়গা ছিল। এই সব মিলে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে এসে- ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত-ই-ইসলামী এখন বিএনপির কাছ থেকে কার্যত বাংলাদেশের “বিভক্ত” রাজনীতিতে তাদের অংশের নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

বিএনপিও তাদের সুশীল সমর্থকরা বিষয়টি বুঝতে পারছে বলে নানান তথাকথিত জরিপসহ অনেক কিছুই হাজির করা হচ্ছে— যে আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট হলে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা বেশি অংশ বিএনপিকে ভোট দেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগের কট্টর ভোট যা তাদের যে কোনো বিপর্যয়ের পরেও ৩০ পারসেন্টের ওপরে থাকে। এদের একটি ছোট অংশ এখনও বেঁচে আছে যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভোটার। বাদবাকী শেখ হাসিনার ভোটার। বর্তমানের ক্ষমতাসীনদের কাছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কাছেও শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হলেও— আওয়ামী লীগের ওই ৩০ পারসেন্টের বয়সভিত্তিক হিসাব করলে ২৮% এর ভালোবাসার নেতা শেখ হাসিনা। তারা তাকে সফলই মনে করে। তারা যে শুধু তাঁকে পদ্মা সেতু থেকে বিধবা ভাতার নেত্রী মনে করে তা নয়— তারা তাঁর প্রতি অন্ধ।

তাই আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোটে এই ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়া অনেকটা দুঃসাধ্য বিষয়। একমাত্র জোর করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে সকলের সামনে তাদেরকে দিয়ে যদি ব্যালটে সিল দেওয়ানো যায়— তাহলে হয়তো বিএনপি তাদের ভোট পেতে পারে।

তাছাড়া যে সহজ হিসাব করা হচ্ছে— বিএনপি তুলনামূলক জামায়াত-ই-ইসলামীর থেকে লিবারেল তাই আওয়ামী লীগাররা তাদের ভোট দেবে। এবং এমন কিছু ভোটার দেখাও যাচ্ছে। এই ভোটারগুলো বা এই শহুরে মিডল ক্লাসের এ অংশটি মূলত বিএনপিরই— গত পনের বছর ধরে তারা সুযোগ-সুবিধার জন্য সাহসিকাকে ছেড়ে আপসকামীর সঙ্গে যোগ দিয়ে মধু খেয়েছিল। কিন্তু এরা সংখ্যার হিসেবে ভোটের রাজনীতিতে এমন কোনো বিষয় নয়।

তাছাড়া আওয়ামী লীগ অনেক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে চলা একটি রাজনৈতিক দল।  তাই এ দলের প্রকৃত কর্মীরা দল ক্ষমতায় থাকলে দলের কাছে উপেক্ষিত হয় ঠিকই— কিন্তু তাদের রাজনীতিতে তারা অটল থাকে।

এদেরকে অনেকে বলে, তাদের প্রভু আছে অন্য জায়গায়। এটাও সঠিক নয়। তাদের প্রভু যদি কাউকে কাউকে বলা হয় তাহলে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা। আর রাজনীতি ও ভোটের হিসাব-নিকাশে তারা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্রবিন্দু ধরেই তাদের লাভ-লোকসান হিসাব করবে।

এ কারণে আওয়ামী লীগ ছাড়া যে কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটার মাইনাস করেই ভোটের অঙ্ক কষতে হবে।

আর এই অঙ্কের ছকে দেখা যাচ্ছে— ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জামায়াত-ই-ইসলামী তাদের প্রতিটি দাবার চালে জিতছে। এমনকি তারেক রহমানের দেশে আসা ও বেগম জিয়ার মৃত্যু ঘিরে এত কিছুর পরেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন তাদের জয়ের ধারা দাপটের সঙ্গে অক্ষুণ্ন রেখেছে। যা একটি বড় ঈংগিত।

৫ আগস্ট পরবর্তী ছাত্র রাজনীতিতে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে ধরে নিয়েছিল— ছাত্রলীগ চলে গেছে এখন ছাত্র দল। হিসাব মেলেনি। যারা এ দেশের রাজনীতি আবেগের বাইরে গিয়ে হিসেব করে তারা এই হিসাব না মেলাকেই স্বাভাবিক ধরেছে ৫ আগস্ট রাত থেকে ধীরে ধীরে।

আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হলে— যতই নির্বাচন কাছে আসবে জামায়াত-ই-ইসলামীর নাটাই থেকে একের পর এক সুতো যে তখন খুলবে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

পাহাড়ে নীরব প্রত্যাবর্তন: জাবারখেতের বনে বন্যপ্রাণী ও নরম পর্যটনের নতুন পথ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের পুরো-প্যানেল বিজয়— নন-ইনক্লুসিভ জাতীয় নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি কি?

১১:৫৯:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে বেগম জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত শুধু নয়— দেশের শীর্ষ পত্রিকায় বিড়াল “জেবু কাহিনী” মূল সংবাদ হয়ে ওঠার রেশ না কাটতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আর এ সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবির পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়েছে।

তাই স্বাভাবিকই ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি ছাত্র শিবির যে ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হচ্ছিল তার থেকে একটু আলাদা করে দেখতে হবে  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়টিকে। আর তা খুব বেশি আলাদা যে তা নয়। বরং বলা যেতে পারে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী যে ড্রাইভিং সিটে ছিল, তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা ও বেগম জিয়াকে ঘিরে সকল প্রচেষ্টার পরেও জামায়াত-ই-ইসলামী যে সেই ড্রাইভিং সিটে আছে তারই প্রকাশ এ নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের বিজয়।

৫ আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পরে কিছু সময়ের জন্য সেনাবাহিনী প্রধান দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার ড্রাইভিং সিটে এসেছিলেন। এবং সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

শিবির-সমর্থিত প্যানেলের বড় জয়

কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস যদিও বলেছেন, ৫ আগস্ট তার অ্যামেজিং ম্যাটিকুলাস ডিজাইনড প্লানের রেজাল্ট। তার পরেও তিনি স্বীকার করেছেন, সেনাবাহিনীর সমর্থন না পেলে তারা সফল হতে পারতেন না। এ ক্ষেত্রে অন্তত মুহাম্মদ ইউনূস কোনো অসত্য বলেননি। কারণ দেশের মানুষ এটা দেখেছে।

যাহোক ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা না যেতেই রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ড্রাইভারের সিটে চলে আসে বাংলাদেশে জামায়াত-ই-ইসলামী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে শুধু নয়, জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে এ ধরনের অবস্থানে আসা এটাই প্রথম। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী’র ন্যাচারাল আলাইস বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এতদিন তাদের এই ধারার রাজনীতির ড্রাইভারের সিটটিতে ছিল। জামায়াত-ই-ইসলামী সহযাত্রী ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরে এই সিটটি ও অবস্থান বদল হয়ে গেছে।

আর সিটটি যে বদল হয়ে গেছে তা বিএনপিও তার সিভিল সোসাইটির মিত্ররা বুঝতে পেরেছে। যে কারণে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের সকল সংস্কার মেনে নিয়ে, এমনকি জুলাই চার্টারে সই করেও অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। সর্বশেষ তারা একদিকে যেমন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মিত্র পরিবর্তন করে বা কিছুটা মুখ পরিবর্তন করে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে এই ড্রাইভারে সিটটি দখল করার চেষ্টা করছে।

কিন্তু দুই শিবিরে বিভক্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শিবিরের সমর্থনের বলে বিএনপি এতদিন জামায়াত ইসলামীকে পার্শ্ব চরিত্র রেখে নিজে মূল চরিত্র বা নায়কের ভূমিকায় ছিল— ওই শিবিরের নায়ক বা মূল চরিত্র ৫ আগস্টের পরে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত-ই-ইসলামী দখল করেছে। এখানে দখল শব্দটি বাস্তবে খুব সঠিক প্রয়োগ নয়। ব্যবহার করতে হচ্ছে এ কারণে যে জামায়াত-ই-ইসলামী যে এই ড্রাইভারের আসনটি পেয়েছে তা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়— একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে, আর যে ঘটনায় পুলিশ, র‍্যাব, সামরিক বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র ক্যাডার ও সাধারণ মানুষের রক্তপাত ঘটেছে।

তবে এর পরেও বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সমর্থক শক্তির অনুপস্থিতি ও নিশ্চুপতায় এটাই অবধারিত ছিল।

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সেখানে না গিয়ে শুধু বলা যায়— বিএনপি ও জামায়াত-ই-ইসলামী মিলিতভাবে এতদিন যে রাজনীতি করে এসেছে ওই রাজনীতির মৌল অংশের মালিকানা জামায়াত-ই-ইসলামীর। ওই মৌল অংশটুকু অনেক কঠিন। ওই কঠিন অংশের শরীরে অনেকগুলো সফট আস্তরণ লাগিয়ে বিএনপি এগিয়ে চলেছে— মূল ভূমিকায় থেকে। আর জামায়াত-ই-ইসলামী অপেক্ষা করেছে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাপের সমাজ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনের জন্য।

জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে জামায়াতের ভূমি তৈরির একটা জায়গা ছিল। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রত্যক্ষ ভূমি তৈরির জায়গা ছিল। এই সব মিলে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে এসে- ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত-ই-ইসলামী এখন বিএনপির কাছ থেকে কার্যত বাংলাদেশের “বিভক্ত” রাজনীতিতে তাদের অংশের নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

বিএনপিও তাদের সুশীল সমর্থকরা বিষয়টি বুঝতে পারছে বলে নানান তথাকথিত জরিপসহ অনেক কিছুই হাজির করা হচ্ছে— যে আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট হলে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা বেশি অংশ বিএনপিকে ভোট দেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগের কট্টর ভোট যা তাদের যে কোনো বিপর্যয়ের পরেও ৩০ পারসেন্টের ওপরে থাকে। এদের একটি ছোট অংশ এখনও বেঁচে আছে যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভোটার। বাদবাকী শেখ হাসিনার ভোটার। বর্তমানের ক্ষমতাসীনদের কাছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কাছেও শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হলেও— আওয়ামী লীগের ওই ৩০ পারসেন্টের বয়সভিত্তিক হিসাব করলে ২৮% এর ভালোবাসার নেতা শেখ হাসিনা। তারা তাকে সফলই মনে করে। তারা যে শুধু তাঁকে পদ্মা সেতু থেকে বিধবা ভাতার নেত্রী মনে করে তা নয়— তারা তাঁর প্রতি অন্ধ।

তাই আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোটে এই ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়া অনেকটা দুঃসাধ্য বিষয়। একমাত্র জোর করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে সকলের সামনে তাদেরকে দিয়ে যদি ব্যালটে সিল দেওয়ানো যায়— তাহলে হয়তো বিএনপি তাদের ভোট পেতে পারে।

তাছাড়া যে সহজ হিসাব করা হচ্ছে— বিএনপি তুলনামূলক জামায়াত-ই-ইসলামীর থেকে লিবারেল তাই আওয়ামী লীগাররা তাদের ভোট দেবে। এবং এমন কিছু ভোটার দেখাও যাচ্ছে। এই ভোটারগুলো বা এই শহুরে মিডল ক্লাসের এ অংশটি মূলত বিএনপিরই— গত পনের বছর ধরে তারা সুযোগ-সুবিধার জন্য সাহসিকাকে ছেড়ে আপসকামীর সঙ্গে যোগ দিয়ে মধু খেয়েছিল। কিন্তু এরা সংখ্যার হিসেবে ভোটের রাজনীতিতে এমন কোনো বিষয় নয়।

তাছাড়া আওয়ামী লীগ অনেক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে চলা একটি রাজনৈতিক দল।  তাই এ দলের প্রকৃত কর্মীরা দল ক্ষমতায় থাকলে দলের কাছে উপেক্ষিত হয় ঠিকই— কিন্তু তাদের রাজনীতিতে তারা অটল থাকে।

এদেরকে অনেকে বলে, তাদের প্রভু আছে অন্য জায়গায়। এটাও সঠিক নয়। তাদের প্রভু যদি কাউকে কাউকে বলা হয় তাহলে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা। আর রাজনীতি ও ভোটের হিসাব-নিকাশে তারা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্রবিন্দু ধরেই তাদের লাভ-লোকসান হিসাব করবে।

এ কারণে আওয়ামী লীগ ছাড়া যে কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটার মাইনাস করেই ভোটের অঙ্ক কষতে হবে।

আর এই অঙ্কের ছকে দেখা যাচ্ছে— ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জামায়াত-ই-ইসলামী তাদের প্রতিটি দাবার চালে জিতছে। এমনকি তারেক রহমানের দেশে আসা ও বেগম জিয়ার মৃত্যু ঘিরে এত কিছুর পরেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন তাদের জয়ের ধারা দাপটের সঙ্গে অক্ষুণ্ন রেখেছে। যা একটি বড় ঈংগিত।

৫ আগস্ট পরবর্তী ছাত্র রাজনীতিতে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে ধরে নিয়েছিল— ছাত্রলীগ চলে গেছে এখন ছাত্র দল। হিসাব মেলেনি। যারা এ দেশের রাজনীতি আবেগের বাইরে গিয়ে হিসেব করে তারা এই হিসাব না মেলাকেই স্বাভাবিক ধরেছে ৫ আগস্ট রাত থেকে ধীরে ধীরে।

আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হলে— যতই নির্বাচন কাছে আসবে জামায়াত-ই-ইসলামীর নাটাই থেকে একের পর এক সুতো যে তখন খুলবে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.