কোলাহলমুক্ত বনে নিজের গতিতে হাঁটা, যেখানে বন্যপ্রাণীই প্রথম অধিকার পায়—এমন অভিজ্ঞতা কি আদৌ সম্ভব? পাহাড়ের ঢালে আবর্জনাহীন পিকনিক, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, আর অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই পর্যটন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ে নীরবে গড়ে উঠেছে এক ভিন্ন মডেল। মুসৌরির কাছে অবস্থিত জাবারখেত নেচার রিজার্ভ দেখাচ্ছে, সংরক্ষণ আর পর্যটন একে অন্যের বিরোধী নয়, বরং সঠিক পথে চললে সহযাত্রী হতে পারে।
পাতার আড়ালে জীবনের শব্দ
ঘন ওক, দেবদারু, রডোডেনড্রন আর আখরোটের পাতার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসে মিষ্টি সুর। রুফাস সিবিয়া পাখির গান পাতার রঙের সঙ্গে মিশে যায়, নীচে মোটা পাতার আস্তরণে ফার্ন নুয়ে পড়ে। মাথার উপর আকাশে ধীরে ভাসে হিমালয়ান গ্রিফন শকুন। কোথাও ঝাড়ু নেই, কৃত্রিম সাজ নেই—এখানে বন নিজস্ব ছন্দে বাঁচে।

পরিচিত পর্যটনের বাইরে তৃতীয় পথ
ভারতে বন্যপ্রাণী পর্যটন মানেই নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িতে ঢোকা, নামা নিষেধ, তারকা প্রাণীর ভিড়। আবার আছে কঠিন ট্রেক আর নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পাখিদর্শন। জাবারখেত দেখাচ্ছে তৃতীয় পথ—পুনরুদ্ধার করা বনে ধীর পদচারণা, যেখানে মানুষ অতিথি, আর বন্যপ্রাণী স্বাগতিক।
দশ বছরে ফিরে আসা বন
দশ বছর আগে এই রিজার্ভ যাত্রা শুরু করে। ইতিহাস বলছে, একসময় এই পাহাড় বন্যপ্রাণীতে ভরপুর ছিল। সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা আর শিকার বনকে ক্ষতবিক্ষত করে। পরিবর্তনের সূচনা হয় পরিচর্যা দিয়ে। ঢাল থেকে শত শত কেজি আবর্জনা সরানো হয়, আগ্রাসী আগাছা পরিষ্কার করা হয়। ধীরে ধীরে বন আবার নিঃশ্বাস নিতে শেখে।
আজ এখানে দেখা মেলে চিতাবাঘ, কাকর হরিণ, গোরাল, হলদে গলার মার্টেন, বনবিড়াল, কালো ভালুক, শজারু, বন্য শূকর, শিয়াল, খরগোশ, সিভেট আর সাম্বার হরিণের। এই প্রত্যাবর্তন হঠাৎ নয়; এটি দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য আর সীমিত ব্যবহারের ফল।

নরম পর্যটন, স্থানীয় মানুষের ভরসা
মুসৌরি পর্যটনে ঠাসা। হেলিপ্যাড, কৃত্রিম ফোয়ারা, ঝাঁপাঝাঁপির প্রতিশ্রুতি নয়—এখানে বেছে নেওয়া হয়েছে ধীরতা। টিকিট ভিত্তিক ট্রেইল চালু করে পাশের গ্রামের মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। পাহাড় চেনার ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান আর প্রাকৃতিক ইতিহাসের নতুন ভাষা—দুটো মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জীবিকা।
এক তরুণ প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসাই এখন তাঁর কাজ। মহামারির নীরব সময়ে রোদ পোহানো চিতাবাঘ শাবকের দৃশ্য তাঁর কাছে স্মরণীয়। এই বন শুধু দেখার জায়গা নয়, আশ্রয়ও।
সংরক্ষণ মানেই গবেষণা
অক্ষত আবাস থাকলে অধ্যয়নও সম্ভব। একশ একর জায়গায় অসংখ্য প্রজাতির ঘাস, ফুল, ফার্ন, ছত্রাক আর শতাধিক পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে—ছাঁটাছাঁটি আর কৃত্রিম সৌন্দর্য ছাড়াই প্রকৃতি সমৃদ্ধ হয়। পাহাড়ে রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে ভূমিধস, আরাভল্লীতে খননের চাপ—এই বাস্তবতায় প্রতিটি রক্ষা পাওয়া বনখণ্ড বন্যপ্রাণীর জন্য সেতু ও আশ্রয়।
সম্ভাবনার মানচিত্র
আফ্রিকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন রিজার্ভ জনপ্রিয়। ভারতে দায়িত্বশীল মডেল এখনও সম্ভাবনায়। জাবারখেত দেখাচ্ছে, যদি বন্যপ্রাণীকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করা যায়, আর পর্যটনকে নরম রাখা যায়—তবে ব্যক্তিমালিকানার মধ্যেও সংরক্ষণ বাস্তব হতে পারে। প্রশ্নটা এখন একটাই—এমন নীরব বন কি আরও ফিরবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















