রাতের আকাশে সাদা আলোর দীর্ঘ নদী যেন নিঃশব্দে বয়ে যায়। এই আলোকধারা আসলে আমাদেরই গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে, যার বুকে রয়েছে পৃথিবী ও সৌরজগৎ। প্রাচীন আরব ভ্রমণকারীদের কাছে এটি ছিল পথপ্রদর্শক এক বিশ্বস্ত আকাশনদী। তারা একে তুলনা করতেন ছড়িয়ে থাকা খড়ের সঙ্গে, আবার ডাকতেন তারার জননী নামে। কারণ অসংখ্য উজ্জ্বল নক্ষত্রের সমাহার এই বিশাল গ্যালাক্সি যুগ যুগ ধরে মানুষের কল্পনাকে আলোড়িত করেছে।
গ্যালাক্সির গঠন ও বয়স
মিল্কিওয়ে একটি সর্পিল গ্যালাক্সি। এর বয়স প্রায় ১৩.২ বিলিয়ন বছর বলে ধারণা করা হয়। এর চারটি প্রধান বাহু রয়েছে, যার একটিতে অবস্থান করছে আমাদের সৌরজগৎ। সব বাহুই ঘিরে রেখেছে এক উজ্জ্বল কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে। পুরো গ্যালাক্সিটির ব্যাস প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার আলোকবর্ষ। এতে রয়েছে আনুমানিক দুইশো বিলিয়ন নক্ষত্র, যা গ্যাস ও ধুলিকণার মেঘের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
প্রতিবেশী মেঘ ও দৃশ্যমানতা
মিল্কিওয়ের নিকটে বৃহৎ ম্যাজেলানিক মেঘ ও ক্ষুদ্র ম্যাজেলানিক মেঘ নামে দুটি গ্যালাক্টিক মেঘ ঘোরে। বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চল থেকে খালি চোখেই এদের দেখা যায়। এই দুটি মেঘ আমাদের গ্যালাক্সির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাজাগতিক প্রতিবেশের এক চমকপ্রদ দৃশ্য তৈরি করে।

কেন্দ্রে অদৃশ্য দৈত্য
এই বিশাল গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে এক অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। এর ভর সূর্যের ভরের চার মিলিয়নেরও বেশি। কাছাকাছি আরেকটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরও রয়েছে, যার ভর প্রায় এক লক্ষ সূর্য ভরের সমান। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই কেন্দ্রীয় অঞ্চলে আলো ঝলকানি ও প্রবল শক্তির বিস্ফোরণ প্রায়ই ঘটে, যা গ্যালাক্সির অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে অস্থির ও গতিশীল করে তোলে।
ভর নিয়ে নতুন হিসাব
দুই হাজার তেইশ সালের এক গবেষণায় জানা যায়, মিল্কিওয়ের মোট ভর আগের ধারণার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ কম। নতুন হিসাব অনুযায়ী, গ্যালাক্সিটির ভর সূর্যের প্রায় দুইশো বিলিয়ন গুণ, যা পূর্ববর্তী অনুমানের তুলনায় অনেকটাই কম। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান ও গ্যালাক্সির গঠন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
মানুষের কল্পনা থেকে আধুনিক বিজ্ঞান পর্যন্ত মিল্কিওয়ে এক বিস্ময়ের নাম। রাতের আকাশে যে আলোকনদী আমরা দেখি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি নক্ষত্র, অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বর আর অসংখ্য অজানা রহস্য।
Sarakhon Report 















