০২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
অষ্টম দিনে ২৯ কোটির পথে ‘ডাকয়িত’, আগের ছবির রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন গতি স্মার্টফোনের নিয়ম স্কুলের গেটেই থেমে গেলে: অভিভাবকদের ভূমিকাই বড় প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জের পানির ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসে ২ শ্রমিকের মৃত্যু নিখোঁজের দুই দিন পর বস্তার ভেতর মিলল শিশুর লাশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শোক ও ক্ষোভ বিবিসি উপস্থাপক সোফি রাওর্থ: শোক, সংগ্রাম আর দৌড়ে জীবন বদলের গল্প রবীন্দ্র সরোবরে আবারও কনসার্ট বাতিল, আক্ষেপ জানালেন ইভান চট্টগ্রামে ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, তীব্র লোডশেডিংয়ে নাকাল জনজীবন রাতভর লাইনে থেকেও তেল মিলছে না: জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে অচলাবস্থা জমিজমা বিক্রি করে ভারতে পাড়ি, সীমান্তেই গুলিতে প্রাণ গেল বাংলাদেশির সীমান্তজুড়ে জ্বালানি তেল জব্দ অভিযান জোরদার, বাড়ছে মজুত ও পাচার ঠেকানোর চাপ

রাতভর লাইনে থেকেও তেল মিলছে না: জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে অচলাবস্থা

দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানি সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছুটির দিনেও মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না। রাজধানী থেকে জেলা—প্রায় সর্বত্রই পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন, কোথাও আবার পাম্প বন্ধ বা সীমিত বিক্রি চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না, ফলে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনে।

সংকটের চক্রে আটকে সরবরাহ ব্যবস্থা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ পাম্পে এখন নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে। কিন্তু সীমিত সরবরাহের কারণে অল্প সময়েই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন করে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই অসমতা পুরো ব্যবস্থাকে এক ধরনের চক্রে আটকে ফেলেছে।

রাজধানীতে দীর্ঘ অপেক্ষা, তবু অনিশ্চয়তা
মহাখালী, খিলক্ষেত, বাংলামটর, রমনা, আসাদগেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ গাড়ির ভেতরেই রাত কাটিয়েছেন, কেউ রাস্তার পাশে অপেক্ষা করেছেন। তবুও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না অনেকের। কোথাও ১০-১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল মেলেনি।

রমনা এলাকায় এক মোটরসাইকেল চালক জানান, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন এগোয়নি। একই অভিজ্ঞতা তেজগাঁওয়ের এক গাড়িচালকেরও—তিনি প্রায় ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন।

দেশে জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু, কোন গাড়ি কত লিটার পাবে?

সরবরাহে বিলম্ব, ক্ষোভ বাড়ছে
পাম্পকর্মীরা বলছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ দেরিতে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। যখন তেল আসে, তখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভিড় করে। ফলে রেশনিং করে সীমিত তেল দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে লাইন কমছে না, অন্যদিকে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে।

এর মধ্যে ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। সাধারণ চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তারা তেল পাচ্ছেন না, অথচ প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ লাইনের বাইরে গিয়ে দ্রুত তেল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে অনেক জায়গায় উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে আরও জটিল পরিস্থিতি
চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ৪৬টি পাম্প থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় অকটেন ও পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পাম্প বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও শুধু সীমিত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

সিলেটে একাধিক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড দেখা গেছে। অনেক চালক ১৫-২০টি পাম্প ঘুরেও তেল পাননি। প্রতিদিন মাত্র ২০০০ লিটার বরাদ্দ থাকায় চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে পরিবহন খাতে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য হাহাকার

কৃষিতেও প্রভাব
বগুড়ায় এই সংকট সরাসরি কৃষিতে প্রভাব ফেলেছে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় ৫০-৬০ টন কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না, উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

নাটোরে সহিংসতা
নাটোরে তেল সংকট ঘিরে উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। একটি পাম্পে দেরিতে ডিজেল দেওয়ায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে তেল না পেয়ে কৃষকরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে সরবরাহের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সরকার বলছে মজুত পর্যাপ্ত
সংকটের মধ্যে সরকার ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি মজুত রয়েছে। এপ্রিল-মে মাসের চাহিদা পূরণের মতো মজুত আছে এবং জুনের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্রুড অয়েল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। কিছু ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছিল, তবে নতুন কার্গো এলে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের সব বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য

পুলিশের বিশেষ সুবিধার দাবি
এই পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। তাদের দাবি, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে জরুরি দায়িত্ব পালনে বিলম্ব হচ্ছে। তাই পাম্পগুলোতে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা লাইন বা বিশেষ বুথ চালুর দাবি জানানো হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

অষ্টম দিনে ২৯ কোটির পথে ‘ডাকয়িত’, আগের ছবির রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন গতি

রাতভর লাইনে থেকেও তেল মিলছে না: জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে অচলাবস্থা

১২:২৮:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানি সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছুটির দিনেও মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না। রাজধানী থেকে জেলা—প্রায় সর্বত্রই পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন, কোথাও আবার পাম্প বন্ধ বা সীমিত বিক্রি চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না, ফলে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনে।

সংকটের চক্রে আটকে সরবরাহ ব্যবস্থা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ পাম্পে এখন নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে। কিন্তু সীমিত সরবরাহের কারণে অল্প সময়েই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন করে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই অসমতা পুরো ব্যবস্থাকে এক ধরনের চক্রে আটকে ফেলেছে।

রাজধানীতে দীর্ঘ অপেক্ষা, তবু অনিশ্চয়তা
মহাখালী, খিলক্ষেত, বাংলামটর, রমনা, আসাদগেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ গাড়ির ভেতরেই রাত কাটিয়েছেন, কেউ রাস্তার পাশে অপেক্ষা করেছেন। তবুও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না অনেকের। কোথাও ১০-১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল মেলেনি।

রমনা এলাকায় এক মোটরসাইকেল চালক জানান, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন এগোয়নি। একই অভিজ্ঞতা তেজগাঁওয়ের এক গাড়িচালকেরও—তিনি প্রায় ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন।

দেশে জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু, কোন গাড়ি কত লিটার পাবে?

সরবরাহে বিলম্ব, ক্ষোভ বাড়ছে
পাম্পকর্মীরা বলছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ দেরিতে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। যখন তেল আসে, তখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভিড় করে। ফলে রেশনিং করে সীমিত তেল দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে লাইন কমছে না, অন্যদিকে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে।

এর মধ্যে ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। সাধারণ চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তারা তেল পাচ্ছেন না, অথচ প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ লাইনের বাইরে গিয়ে দ্রুত তেল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে অনেক জায়গায় উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে আরও জটিল পরিস্থিতি
চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ৪৬টি পাম্প থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় অকটেন ও পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পাম্প বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও শুধু সীমিত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

সিলেটে একাধিক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড দেখা গেছে। অনেক চালক ১৫-২০টি পাম্প ঘুরেও তেল পাননি। প্রতিদিন মাত্র ২০০০ লিটার বরাদ্দ থাকায় চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে পরিবহন খাতে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য হাহাকার

কৃষিতেও প্রভাব
বগুড়ায় এই সংকট সরাসরি কৃষিতে প্রভাব ফেলেছে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় ৫০-৬০ টন কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না, উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

নাটোরে সহিংসতা
নাটোরে তেল সংকট ঘিরে উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। একটি পাম্পে দেরিতে ডিজেল দেওয়ায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে তেল না পেয়ে কৃষকরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে সরবরাহের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সরকার বলছে মজুত পর্যাপ্ত
সংকটের মধ্যে সরকার ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি মজুত রয়েছে। এপ্রিল-মে মাসের চাহিদা পূরণের মতো মজুত আছে এবং জুনের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্রুড অয়েল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। কিছু ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছিল, তবে নতুন কার্গো এলে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের সব বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য

পুলিশের বিশেষ সুবিধার দাবি
এই পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। তাদের দাবি, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে জরুরি দায়িত্ব পালনে বিলম্ব হচ্ছে। তাই পাম্পগুলোতে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা লাইন বা বিশেষ বুথ চালুর দাবি জানানো হয়েছে।