বিশ্বজুড়ে ৭৯টি শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য ফোন নিষিদ্ধ করে। দক্ষিণ কোরিয়া গত আগস্টে আইন পাস করে, যাতে শিক্ষার্থীদের পুরো স্কুল সময়জুড়ে ডিভাইস শিক্ষকদের কাছে জমা দিতে হয়। হাঙ্গেরি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলকে ফোনমুক্ত ঘোষণা করেছে। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু জাপান এখনো স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে।
গবেষণায় দেখা যায়, স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনলে পড়াশোনা, মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। তবে এসব নীতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এগুলো শুধু স্কুলের ভেতরেই কার্যকর। ঘণ্টা শেষ হলেই ফোন বেরিয়ে আসে, এবং আগের পরিবেশই আবার আচরণকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ নীতিনির্ধারকেরা সমস্যার সহজ অংশটুকু নিয়েই বেশি কাজ করেছেন।
কঠিন অংশটি রয়েছে বাড়িতে, গণপরিবহনে এবং রাস্তায়। জাপানের আইচি প্রদেশের একটি ছোট শহর এই ফাঁকটি স্পষ্ট করে এমন তথ্য তুলে ধরেছে।
অভিভাবকদের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
টোয়োআকে শহরের মেয়র মাসাফুমি কৌকি যখন তার শহরের অধ্যাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন, তখন কর্মকর্তারা আপত্তি জানান। কেন শিশুদের বাইরে গিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে? অধিকাংশ দেশই কেবল অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ফ্রান্স স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করেছে। ফলে প্রাথমিক লক্ষ্য শিশু হওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছিল।
কিন্তু কৌকি একমত হননি। তার যুক্তি ছিল, শিশুরা বড়দের আচরণ দেখেই শেখে। বড়রা যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শিশুদের ফোন নামাতে বলা কার্যকর হবে না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া এই অধ্যাদেশটি জাপানে প্রথম। এতে প্রতিদিন অবসরের সময় সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা সব বয়সের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

ছয় মাস পরের তথ্য
ছয় মাস পর জরিপে দেখা যায়, কৌকির ধারণা সঠিক ছিল। ৪,৩১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৫ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে। প্রায় ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী দিনে সাত ঘণ্টা বা তার কম ঘুমায়। প্রতি ১০ জনে প্রায় ৪ জন জানায়, স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে তারা দেরিতে ঘুমাতে যায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অন্য জায়গায়। যেসব শিশু দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের অভিভাবকদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। অথচ মাত্র ১০.১ শতাংশ পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের জন্য একসঙ্গে স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারে নিয়ম থাকলেও তা শুধু শিশুর জন্য প্রযোজ্য।
এটি শুধু টোয়োআকের সমস্যা নয়, বরং গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর একটি বড় বাস্তবতা।
নীতির সীমাবদ্ধতা
প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা আইনগতভাবে জটিল, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া সহজ এবং জনপ্রিয়। তাই সরকারগুলো শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সীমিত করে, স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ করে এবং বয়সভিত্তিক নিয়ম আরোপ করে, কিন্তু বড়দের আচরণে হস্তক্ষেপ করে না।
ফলে শুধু শিশুদের লক্ষ্য করে নেওয়া নীতিতে একটি বড় ফাঁক থেকে যায়। সমস্যা সমাধানে দুই প্রজন্মকেই অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

“শিশু ও স্ক্রিন” নয়, “পরিবার ও স্ক্রিন”
এ পর্যন্ত বিষয়টি “শিশু ও স্ক্রিন” হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র “পরিবার ও স্ক্রিন”। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান কাঠামোতে সমাধানগুলো শুধু নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ—যেমন স্কুল বা লাইব্রেরি—পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে।
টোয়োআকের তথ্য বলছে, যেসব পরিবারে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার দুই ঘণ্টার কম, সেসব পরিবারে সবার জন্যই নিয়ম রয়েছে। যদিও এটি সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না, তবে একটি নতুন প্রশ্ন তোলে—শুধু শিশুর আচরণ নয়, বাড়ির পরিবেশ কীভাবে পরিবর্তন করা যায়।
সচেতনতার সূচনা
এই অধ্যাদেশে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই। কৌকি এটিকে “দর্শনভিত্তিক অধ্যাদেশ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার লক্ষ্য সমস্যাকে সামনে আনা এবং আলোচনা শুরু করা।
তিনি দ্রুত পরিবর্তনের আশা করেননি। স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়, স্ক্রিন ব্যবহার কমেনি। তাতে তিনি বিস্মিত হননি। তার মতে, সচেতনতা তৈরি করাই প্রথম ধাপ।
তবে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। প্রায় ২৪.৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছে, এই উদ্যোগ তাদের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করেছে। প্রায় প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি আগে না হওয়া আলোচনা শুরু করেছে।

নীতির আসল মূল্য
এই ধরনের নীতির আসল শক্তি নিয়ম মানাতে নয়, বরং আলোচনা শুরু করার সুযোগ তৈরি করা। অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারেন যে তারা সন্তানের সামনে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করছেন। কিন্তু সামাজিকভাবে স্বীকৃত কোনো মানদণ্ড না থাকায় বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায়েই থেকে যায়। একটি নীতি সেই বিষয়টিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করলে সমালোচনা বাড়ে। কৌকি তা জানতেন। ভোটের পর ৩০০টির বেশি বার্তা আসে সিটি হলে, অনলাইনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তার মতে, এই বিতর্কই প্রয়োজনীয়, কারণ বিতর্ক ছাড়া পরিবর্তন আসে না।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
এখনো জাতীয় পর্যায়ে কোনো নীতিগত পরিবর্তন হয়নি। অন্য শহরগুলো প্রশংসা করলেও একই পথ অনুসরণ করেনি।
তবে টোয়োআকের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করলে পারিবারিক অংশগ্রহণ বাড়ে, যদিও রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকে।
জাপানসহ বিশ্বজুড়ে স্কুলে স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—স্কুল শেষে কী হয়?
শুধু শিশুদের লক্ষ্য করে নেওয়া নীতিতে বাড়ির বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়। অথচ পরিবারের ডাইনিং টেবিলেই শিশুরা দেখে এবং শেখে—ফোন ব্যবহার আসলে কার জন্য, আর কার জন্য নয়।
ওয়াকা ইকেদা 



















