ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া সংঘাত, যা ‘কনফ্রন্টাসি’ নামে পরিচিত, ছিল বোর্নিও দ্বীপ ও মালয় উপদ্বীপকে কেন্দ্র করে তিন বছরের এক সশস্ত্র সংঘর্ষ। এতে ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন কমনওয়েলথ বাহিনীর অংশ হিসেবে অস্ট্রেলীয় সেনারাও অংশ নেয়। সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ সাবাহ (তৎকালীন নর্থ বোর্নিও) ও সারাওয়াক ইন্দোনেশিয়ার অংশ হবে, নাকি সদ্য গঠিত মালয়ার ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার অংশ হবে—এই প্রশ্ন। এই সংঘাতে ২৩ জন অস্ট্রেলীয় সৈন্য নিহত হন এবং আহত হন আরও ৮ জন।
মালয়া ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তখন বোর্নিও দ্বীপের এক অংশ ছিল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে, আর অন্য অংশ ইন্দোনেশিয়ার অধীনে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ব্রিটেন সিঙ্গাপুর, সারাওয়াক ও নর্থ বোর্নিওকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এ সময় মালয়ার প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুল রহমান প্রস্তাব করেন, এসব অঞ্চলকে একত্র করে মালয়েশিয়া গঠন করা হোক। ব্রিটেন এ উদ্যোগকে সমর্থন করে, কারণ মালয়ার সরকার ছিল ব্রিটেনপন্থী, আর ইন্দোনেশিয়ার সম্প্রসারণবাদী সরকার তখন কমিউনিস্ট-ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হচ্ছিল।
‘কনফ্রন্টাসি’র সূচনা ও উত্তেজনার বিস্তার
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণো এই প্রস্তাবিত ফেডারেশনের বিরোধিতা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ইন্দোনেশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের পথে বাধা ছিল। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে তাঁর সরকার ব্রুনাইয়ে এক অভ্যুত্থানচেষ্টাকে সমর্থন দেয়। সেটি দ্রুত ব্রিটিশ বাহিনী দমন করলেও এর মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুবান্দ্রিও প্রথম ‘কনফ্রন্টাসি’ শব্দটি প্রকাশ্যে ব্যবহার করেন। এরপর ইন্দোনেশিয়া কালিমানতান সীমান্ত পেরিয়ে উত্তর বোর্নিও ও সারাওয়াকে হামলার জন্য অনুপ্রবেশকারী পাঠাতে শুরু করে।
এরপর ব্রিটিশ বাহিনী সীমান্ত সুরক্ষায় এগিয়ে আসে। ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সারাওয়াক ও নর্থ বোর্নিও, মালয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মালয়েশিয়া গঠন করে। শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার মেনজিস সরকার ইন্দোনেশিয়াকে উসকে দিতে না চেয়ে সরাসরি সেনা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে তারা মালয়েশীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, রসদ ও দুটি ছোট নৌযান দেয়। পরে ১৯৬৪ সালে ইন্দোনেশিয়া মালয় উপদ্বীপে হামলা চালালে অস্ট্রেলিয়া সরাসরি সেনা মোতায়েন করে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/indonesia-independence-50879689-5c8c248f46e0fb000187a2b4.jpg)
গোপন অভিযান ‘ক্ল্যারেট’ ও যুদ্ধের পরিসমাপ্তি
সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্রিটিশ মেজর জেনারেল জর্জ লিয়ার অধীনে প্রায় ১৭ হাজার কমনওয়েলথ সেনা ছিল। এদের মধ্যে ব্রিটিশ, গুর্খা, অস্ট্রেলীয়, নিউজিল্যান্ড ও মালয়েশীয় বাহিনী ছিল। অস্ট্রেলিয়া পাঠায় পদাতিক, গোলন্দাজ, সিগন্যালার, ইঞ্জিনিয়ার, স্পেশাল এয়ার সার্ভিস রেজিমেন্ট (এসএএস), নৌবাহিনীর জাহাজ এবং বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন। যুদ্ধের বড় অংশজুড়ে এসএএস ও পদাতিক বাহিনী সীমান্ত টহল, অতর্কিত হামলা এবং ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতানে গোপন অনুপ্রবেশে অংশ নেয়। এসব গোপন অভিযানের কোডনাম ছিল ‘ক্ল্যারেট’।
এই অভিযানগুলো গোপন রাখা হয়, কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তখন জনসমক্ষে জানা গেলে ইন্দোনেশিয়া হয়তো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারত। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে কিছু প্রকাশ হয়নি। ব্রিটেনে ১৯৭৪ সালে এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ২০ বছর পরে এ অভিযানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ কারণেই একে অনেক সময় ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলা হয়। ১৯৬৬ সালের মার্চে সুকর্ণো সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে প্রেসিডেন্ট সুহার্তো বুঝতে পারেন, এই সংঘাত অর্থনৈতিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার জন্য টেকসই নয়। অবশেষে ১৯৬৬ সালের ১১ আগস্ট মালয়েশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















