বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংস আমদানিকারক দেশ চীন নতুন কোটা ও শুল্কনীতি কার্যকর করায় বৈশ্বিক মাংস বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। বেইজিং দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা দিতে ২০২৬ সালের জন্য পৃথক দেশভিত্তিক আমদানি কোটা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প বাজার খুঁজতে হচ্ছে।
চীনের নতুন নীতির আওতায় ২০২৬ সালে মোট গরুর মাংস আমদানির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ লাখ ৮০ হাজার টন, যা ২০২৫ সালের প্রকৃত আমদানির তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম। নির্ধারিত কোটার সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট দেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ৫৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গরুর মাংস রপ্তানিকারক অস্ট্রেলিয়া চলতি মাসেই চীনের জন্য নির্ধারিত ২ লাখ ৫ হাজার টনের কোটা পূরণ করে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ৫৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে চীনে অস্ট্রেলিয়ান মাংস রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার তাজা ও শীতলীকৃত গরুর মাংস রপ্তানি খাতের মূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। দেশটির জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বাজার হলেও চীন উচ্চমানের শস্যভিত্তিক খাদ্যে মোটাতাজাকৃত গরুর মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।
নতুন বাজারের খোঁজে রপ্তানিকারকরা
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রাজিল—চীনের দুই বড় সরবরাহকারী—কোটা পূরণ করার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে চার থেকে পাঁচ লাখ টন গরুর মাংস অন্য বাজারে প্রবাহিত হতে পারে।
রাবোব্যাংকের প্রোটিন বিশ্লেষক অ্যাঙ্গাস গিডলি-বেয়ার্ডের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এ পরিস্থিতি থেকে লাভবান হতে পারে। অতীতে চীনের শক্তিশালী চাহিদার কারণে যে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতো, এখন সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন ও নতুন সমীকরণ
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন শত শত মার্কিন কসাইখানাকে পুনরায় রপ্তানি অনুমোদন দিয়েছে। বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে গত বছর যেসব প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি কমে গিয়েছিল, তারা আবারও চীনা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
গ্লোবাল অ্যাগ্রিট্রেন্ডসের বিশ্লেষক সাইমন কুইলটির মতে, মার্কিন রপ্তানিকারকরা চীনে বাজার অংশীদারিত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার থেকে কিছু সরবরাহ সরিয়ে নিতে পারে। এতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করতে পারে অস্ট্রেলিয়া।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদনও চাপে রয়েছে। গত কয়েক বছরে পশুপালের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশটির গবাদিপশুর সংখ্যা ৭৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে সরবরাহ সীমিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চীনা বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণ সহজ হবে না।

দেশীয় শিল্প রক্ষায় চীনের উদ্যোগ
চীন এক বছরের তদন্ত শেষে এই কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আমদানি বৃদ্ধি দেশীয় গরুর মাংস শিল্পের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে আমদানি রেকর্ড ২৮ লাখ ৭০ হাজার টনে পৌঁছানোর পর দেশীয় উৎপাদকদের মুনাফা ব্যাপকভাবে কমে যায়।
অনেক খামারি ব্যয় কমাতে প্রজননক্ষম গবাদিপশুও জবাই করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ অবস্থায় সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদকদের জন্য বাজারে আরও সুযোগ তৈরি করতে চায়।
চাহিদা ও রোগের প্রভাব
চীনে গরুর মাংসের দাম চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে দুর্বল ভোক্তা চাহিদা শিল্পের পূর্ণ পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মার্কিন কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনে গরুর মাংসের ব্যবহার ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে কিছুটা কমে ১ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টনে নামতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ভোগব্যয়কে প্রভাবিত করছে।
এদিকে মুখ ও খুর রোগের একটি শক্তিশালী ধরন ছড়িয়ে পড়ায় চীনের পশুপালন খাতও নতুন চাপে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ রোগের কারণে পশু নিধন বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে দেশটিতে তাজা গরুর মাংসের সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।
চীনের নতুন গরুর মাংস কোটা
চীনের নতুন কোটা ও শুল্কনীতি বৈশ্বিক গরুর মাংস বাণিজ্যের রূপরেখা বদলে দিচ্ছে। এতে একদিকে দেশীয় উৎপাদকরা কিছুটা সুরক্ষা পেলেও, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোর মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















