যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলে ভাঙচুরের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক অলিম্পিক ক্যানোয়িস্ট ডেভিড হার্নের বিরুদ্ধে আনা মামলা প্রত্যাহার করেছে মার্কিন সরকার। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে প্রসিকিউটররা স্বীকার করেছেন, যে ক্ষতিকে এতদিন ভাঙচুর বলে দাবি করা হচ্ছিল, সেটি আসলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিপূর্ণ ও তড়িঘড়ি করা সংস্কারকাজের ফল।
এই স্বীকারোক্তি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, “বিকৃত মানসিকতার” ভাঙচুরকারীরাই পুলের ক্ষতি করেছে।
যে অভিযোগে হতে পারত ১০ বছরের কারাদণ্ড
গত মাসে গ্রেপ্তার হওয়া ডেভিড হার্নের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়েছিল, যাতে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত।
কিন্তু শুক্রবার আদালতে দাখিল করা নথিতে জানানো হয়, নতুন তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা উদ্যাপনের আগে দ্রুত কাজ শেষ করার চাপে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাড়াহুড়ো করে রঙ ও সিল্যান্ট প্রয়োগ করে। সেই ত্রুটিপূর্ণ কাজের কারণেই পুলের আবরণ উঠে যেতে শুরু করে।
“আমি কিছুই নষ্ট করিনি”—শুরু থেকেই দাবি হার্নের
ডেভিড হার্ন শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি শুধু সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় পুলের পানিতে হাত দিয়েছিলেন। তিনি কোনো রং ছিঁড়ে ফেলেননি, খুঁটিয়ে তোলেননি কিংবা কোনো ধরনের ক্ষতি করেননি।
শুক্রবার মামা প্রত্যাহারের পরও তিনি সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না—এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তাঁর আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, এই মামলা কখনোই দায়ের করা উচিত ছিল না।
তাদের ভাষায়, “আজ মামলা প্রত্যাহার হলেও একজন নির্দোষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিককে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করার মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার মুছে যায় না। সরকারের আচরণ ছিল—আগে গুলি, পরে লক্ষ্য ঠিক করা।”
শুধু হার্ন নন, আরও অনেকেই অভিযুক্ত হয়েছিলেন
আদালতের নথি অনুযায়ী, হার্ন একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন না। আরও অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে একই ধরনের ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং আরও পাঁচজনকে পুলিশ নোটিশ দিয়েছিল।
এর মধ্যে একজন সম্পর্কে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি ধারালো ব্লেড দিয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট দীর্ঘ দাগ কেটেছেন। তবে নতুন স্বীকারোক্তির পর ওইসব মামলার অবস্থাও এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সব অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পেই বড় ত্রুটি
রিফ্লেক্টিং পুলে চলতি বসন্তে বহু মিলিয়ন ডলারের সংস্কারকাজ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে পানির লিকেজ ও কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছিল পুলটি। রাজধানীকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কিন্তু প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয়ে সংস্কার শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নীল রঙের সিল্যান্ট উঠে যেতে শুরু করে। শৈবালও আবার দেখা দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিক বাজেট ছিল ২০ লাখ ডলারেরও কম। পরে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এছাড়া সরকারি প্রকল্পে প্রচলিত উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে ট্রাম্পের নির্বাচিত একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি নথিতেই স্বীকারোক্তি
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর শুরু থেকেই প্রসিকিউটরদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেয়নি। ফলে তদন্তকারীরা ভুল ধারণার ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর যদি শুরুতেই তাদের কাছে থাকা তথ্য প্রকাশ করত, তাহলে গ্র্যান্ড জুরির মাধ্যমে এই অভিযোগ আনারই প্রয়োজন হতো না।
দ্বিতীয়বারের মতো খালি করা হয়েছে পুল
ঘটনার পর গত তিন মাসে দ্বিতীয়বারের মতো রিফ্লেক্টিং পুলের পানি সম্পূর্ণ নিষ্কাশন করা হয়েছে। বর্তমানে পুলটি খালি রয়েছে এবং নতুন করে মেরামতের কাজ চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















