যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো জোরদারের উদ্যোগ ‘প্যাক্স সিলিকা’-তে ফিলিপাইনের অন্তর্ভুক্তিকে সরকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য কমানোর বড় সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এ উদ্যোগ নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারণী মহলে ভিন্নমতও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ঘোষিত সম্ভাবনার তুলনায় বাস্তব সুফল অনেক সীমিত হতে পারে এবং এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।
অস্থায়ী কর্মসংস্থানের শঙ্কা
সমালোচকদের মতে, প্যাক্স সিলিকার আওতায় যে কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে, তার বড় অংশই নির্মাণপর্বকেন্দ্রিক এবং প্রকল্প শেষ হলে সেসব চাকরিরও অবসান ঘটবে। অন্যদিকে সেমিকন্ডাক্টর ও এআই শিল্প অত্যন্ত স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় সাধারণ শ্রমিকের চাহিদা তুলনামূলক কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এ ছাড়া ইলেকট্রনিক্স শিল্পের অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, এ খাতে অনেক ক্ষেত্রেই কম মজুরি, অনিশ্চিত চুক্তিভিত্তিক কাজ এবং দুর্বল শ্রম সুরক্ষা দেখা যায়। ফলে উচ্চ হারে অপূর্ণ কর্মসংস্থানে থাকা মানুষের জন্য এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার প্রশ্ন
সমালোচকদের দাবি, প্যাক্স সিলিকার মূল লক্ষ্য ফিলিপাইনের উন্নয়নের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা। এর মাধ্যমে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন, বিরল খনিজের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা এবং মিত্র দেশগুলোকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর একটি জোটে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিপাইন মূলত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত স্থাপনা, নিকেল ও স্বর্ণের মতো কাঁচামাল সরবরাহ এবং সীমিত মূল্য সংযোজনের ভূমিকায় থেকে যেতে পারে। গবেষণা, নকশা ও উদ্ভাবনের মতো উচ্চমূল্যের খাতে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকলে শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় বনভূমির ক্ষতি, পানিদূষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া নিউ ক্লার্ক সিটি এআই হাব নির্মাণের জন্য টারলাক অঞ্চলের কিছু কৃষককে জমি ছাড়ার অনুরোধ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্যের গুরুত্ব
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে যুক্ত হলে ফিলিপাইন বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
একই সময়ে চীন ফিলিপাইনের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। তাই ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেওয়া হয়েছে। একপক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কী করার পরামর্শ
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকা থেকে প্রকৃত জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, শ্রম অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্থানীয় উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে জাতীয় স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রত্যাশা পূরণ নাও করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
Sarakhon Report 















