অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি ইসরায়েলি বসতি থেকে উঠে আসা এক বাসিন্দার বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের সংঘাত, দখলনীতি এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বাস্তবতা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডকে ন্যায্য বলে দাবি করেন। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
উত্তেজনার পেছনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা
সম্প্রতি পশ্চিম তীরের হাভাত গিলাদ এলাকার কাছে সংঘর্ষে একটি ইসরায়েলি নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। ওই ঘটনায় চার ফিলিস্তিনি এবং এক ইসরায়েলি সেনাও প্রাণ হারান। সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বর্ণনায় ভিন্নতা রয়েছে।
এই ঘটনার পর আশপাশের কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রামে একের পর এক হামলার অভিযোগ ওঠে। এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করে।
‘প্রতিশোধই একমাত্র পথ’—বিতর্কিত দাবি
হাভাত গিলাদের এক বাসিন্দা, যিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েলিদের পক্ষে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন, সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে নিরাপত্তারক্ষীর হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর মানুষের বিরুদ্ধে হামলা চালানো ন্যায্য।
তিনি আরও বলেন, একটি ইহুদি জীবনের মূল্য অসংখ্য ফিলিস্তিনির জীবনের চেয়েও বেশি। তার এই মন্তব্যকে বর্ণবাদী বলা হলে তিনি তা অস্বীকার না করে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে ধর্মীয় যুক্তি তুলে ধরেন।
এই বক্তব্য ইসরায়েলের অনেক নাগরিকের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে কিছু উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীর চিন্তাধারা বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত।
বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
হাভাত গিলাদ বহু বছর আগে প্রতিষ্ঠিত একটি বসতি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অবৈধ বলে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল এই অবস্থান মানে না।
মানবাধিকার সংগঠন ও শান্তি-প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম তীরে বসতি ও অননুমোদিত আউটপোস্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর ওপর চাপ এবং সংঘাতও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেনাবাহিনী নিয়েও ক্ষোভ
সাক্ষাৎকারে ওই বসতি-বাসিন্দা ইসরায়েলি সরকার ও সেনাবাহিনীরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শক্তি প্রয়োগে সংযম দেখানোর কারণেই ভবিষ্যতে আরও হামলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানি ঘটেছে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সময়।
একই সময়ে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় আহতের সংখ্যাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে ইসরায়েলি নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম বলে সংস্থাটির তথ্য তুলে ধরে।

অসম বাস্তবতার অভিযোগ
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা দেশটির বেসামরিক আইনের সুরক্ষা ও সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা পান। বিপরীতে ফিলিস্তিনিরা সামরিক শাসনের অধীনে বসবাস করেন এবং চলাচল, নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন।
ইসরায়েল অবশ্য বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং এসব সমালোচনাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে।
ফিলিস্তিনিদের সামনে তিন পথ?
সাক্ষাৎকারে ওই বসতি-বাসিন্দা বলেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে—ইসরায়েলি শাসন মেনে শান্তভাবে বসবাস করা, অন্য দেশে চলে যাওয়া অথবা প্রতিরোধ চালিয়ে গেলে প্রাণঘাতী পরিণতির মুখোমুখি হওয়া।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য অঞ্চলটির রাজনৈতিক বাস্তবতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রতিফলন, যা ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ভয় আর অনিশ্চয়তার জীবন
হাভাত গিলাদের কাছাকাছি বসবাসকারী অনেক ফিলিস্তিনি জানান, তারা প্রতিদিন আশঙ্কার মধ্যে থাকেন। তাদের অভিযোগ, হামলার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পান না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
অঞ্চলটির বর্তমান বাস্তবতায় একই ভূখণ্ডে পাশাপাশি বসবাস করলেও দুই জনগোষ্ঠীর জীবনকে আলাদা করে রেখেছে দখল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনি বৈষম্য এবং গভীর অবিশ্বাস। ফলে শান্তির সম্ভাবনা যতটা আলোচিত হচ্ছে, বাস্তবে ততটাই জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 














