অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর প্রকাশ্য উসকানিমূলক বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি প্রতিবেশী ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, “সবাইকে হত্যা করতে হবে।” মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এমন বক্তব্য চলমান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এক সংঘর্ষের পর বাড়তে থাকে উত্তেজনা
গত ১৮ জুলাই পশ্চিম তীরের তাল গ্রামে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ওই ঘটনায় হাভাত গিলাদ বসতির একজন নিরাপত্তারক্ষী, চারজন ফিলিস্তিনি এবং একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। তবে সংঘর্ষের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে এখনো ভিন্নমত রয়েছে এবং বিষয়টি বিতর্কিত।
এর পর থেকেই আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলার অভিযোগ সামনে আসে।
‘একজন ইসরায়েলির প্রাণ লাখো ফিলিস্তিনির চেয়েও মূল্যবান’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইনজীবী ইয়েহুদা শিমোন, যিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন ইসরায়েলির পক্ষে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন, প্রতিশোধমূলক হামলাকে সমর্থন করেন।
তিনি দাবি করেন, তাল, সারা, জিত ও ফারাতা গ্রামের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো উচিত। আরও বলেন, একজন ইসরায়েলির জীবনের মূল্য “লাখো ফিলিস্তিনির জীবনের চেয়েও বেশি”।
তার বক্তব্যে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার না করে বলেন, এটাই তার বিশ্বাস।
আন্তর্জাতিক আইন প্রত্যাখ্যান, ধর্মীয় দাবির পুনরাবৃত্তি
ইয়েহুদা শিমোন আন্তর্জাতিক আইনকে প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পশ্চিম তীরের ওপর ইহুদিদের অধিকার রয়েছে।
তার ভাষ্য, ঈশ্বর তাদের এই ভূমি দিয়েছেন এবং সেই কারণেই তারা নিজেদের দাবি ন্যায্য বলে মনে করেন।
একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের আরও শক্তভাবে সমর্থন করা উচিত এবং সংঘর্ষের সময় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরও বেশি প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সব ইসরায়েলি এই মতের সঙ্গে একমত নন
বিবিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলের বহু নাগরিক এই ধরনের চরমপন্থী বক্তব্য সমর্থন করেন না। তবে বসতি সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে একাংশ বসতি স্থাপনকারীর আদর্শিক অবস্থান কীভাবে কাজ করছে, শিমোনের বক্তব্য তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের মতাদর্শ কেবল রাজনৈতিক বিভাজনই নয়, সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
জাতিসংঘের তথ্য কী বলছে
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ৬৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির হিসাবে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এবং তিনজন ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। আরও তিনটি ঘটনার দায় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
একই সময়ে একজন ইসরায়েলিও নিহত হয়েছেন। এছাড়া চলতি বছরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় গড়ে প্রতিদিন তিনজনের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দীর্ঘদিনের দখল ও বসতি সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপট
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে। এরপর সেখানে শত শত বসতি ও অননুমোদিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, যেখানে বর্তমানে পাঁচ লক্ষেরও বেশি ইসরায়েলি বসবাস করেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সরকারি অনুমোদিত বসতি ও অননুমোদিত আউটপোস্ট—উভয়ই অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল এ অবস্থান মেনে নেয় না।
ভয়ের মধ্যে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো
হাভাত গিলাদের আশপাশে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা নতুন করে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী মূলত বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর মানুষ কার্যত কোনো সুরক্ষা পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা তাদের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















