ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা আবারও নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে একটি পাহাড়—‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই এই পাহাড়ের নিচে থাকা সন্দেহভাজন স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে নতুন নির্মাণকাজের চিহ্ন দেখা যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও বাড়ছে কৌতূহল ও উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থাপনাটি শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; এটি ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। যদিও তেহরান দাবি করছে, সেখানে কোনো ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম চলছে না।
কোথায় এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?
‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত পাহাড়টির প্রকৃত নাম ‘কুহ-ই কোলাং’। এটি ইরানের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত।
নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একাধিক হামলার শিকার হয়েছে। কিন্তু একই এলাকার এই পাহাড়ের নিচে নির্মিত বলে ধারণা করা স্থাপনাটি এখন পর্যন্ত সরাসরি হামলার বাইরে রয়েছে।
এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো ধীরে ধীরে পাহাড়ের গভীরে স্থানান্তর করছে।
ট্রাম্প কেন এই স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছেন?
গত জুলাই মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে খুব শিগগিরই ওই এলাকায় ভারী হামলা চালানো হবে। পরে তিনি আরও দাবি করেন, পিকঅ্যাক্সে কী ঘটছে তা তিনি জানেন এবং সমঝোতা না হলে ওই স্থাপনাও ধ্বংস করা হবে।
যদিও তিনি তাঁর দাবির পক্ষে কোনো গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করেননি, তবু তাঁর বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, সেখানে কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অজুহাত তৈরির জন্য এমন অভিযোগ করছে।
পাহাড়ের নিচে কী রয়েছে?
এই স্থাপনার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—পাহাড়ের গভীরে আসলে কী রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এখানে উন্নত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ যন্ত্র বা সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করা হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, নাতাঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর বিকল্প হিসেবেই এই ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
২০২০ সালে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তৎকালীন প্রধান আলী আকবর সালেহি নাতাঞ্জের কাছে পাহাড়ের ভেতরে আরও আধুনিক ও বড় একটি স্থাপনা নির্মাণের কথা বলেছিলেন। যদিও তিনি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নাম উল্লেখ করেননি।
স্যাটেলাইট ছবিতে কী দেখা গেছে?
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়টির চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
চারটি পৃথক সুড়ঙ্গমুখ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—দুটি পূর্ব পাশে এবং দুটি পশ্চিম পাশে।
গত কয়েক মাসে সেখানে ট্রাক, ভারী নির্মাণযন্ত্র এবং নতুন সড়ক নির্মাণের কার্যক্রমও দেখা গেছে। কিছু ছবিতে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে একাধিক নির্মাণযান অবস্থান করতে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয় যে পাহাড়ের ভেতরে এখনো অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
কতটা গভীরে নির্মিত এই কেন্দ্র?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্থাপনাটির মূল অংশ ভূমি থেকে প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত গভীরে থাকতে পারে।
এটি ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার চেয়েও গভীরে অবস্থিত বলে মনে করা হয়।
এ কারণেই প্রচলিত বিমান হামলায় এটি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমাও কি যথেষ্ট?
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা কয়েক দশ মিটার মাটি বা কংক্রিট ভেদ করে বিস্ফোরিত হতে পারে।
তবে বহু সামরিক বিশ্লেষকের মতে, শুধুমাত্র এই বোমা ব্যবহার করেও পুরো স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে।
তবে সুড়ঙ্গের মুখ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ, বায়ু চলাচলের পথ এবং প্রবেশ সড়ক ধ্বংস করে স্থাপনাটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কেন বাড়ছে?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এখন পর্যন্ত এই স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি পায়নি।
সংস্থাটির মহাপরিচালক আগে জানিয়েছিলেন, ইরান সেখানে ভবিষ্যতে পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছে।
এই তথ্যের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরির আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো—যদি এই পাহাড়ের নিচে অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেখানে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় এই স্থাপনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের অবস্থান
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
তেহরান বারবার অস্বীকার করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা করছে।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ এখনো কাটেনি। ফলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক হুমকি আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 














