বিবিসির পরিচিত সংবাদ উপস্থাপক সোফি রাওর্থের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত থেকে। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে ফেরার আগে তিনি জানতে পারেন, তাকে আর আগের মতো প্রধান সংবাদ অনুষ্ঠানে রাখা হবে না। এই সিদ্ধান্ত তাকে ভীষণভাবে আঘাত করে। তবে সেই কঠিন সময়েই তিনি খুঁজে পান নতুন এক শক্তি—দৌড়।
ক্যারিয়ারে ধাক্কা ও মানসিক আঘাত
দীর্ঘদিন জনপ্রিয় সংবাদ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার পর হঠাৎ করে দায়িত্ব বদলে যাওয়ায় রাওর্থ নিজেকে ভেঙে পড়া অনুভব করেন। সহকর্মী ও বন্ধুর পরামর্শে তিনি ধৈর্য ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা কাটছিল না। সেই সময়েই জীবনে আসে দৌড়, যা ধীরে ধীরে তাকে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে।

দৌড়ের মাধ্যমে নতুন শুরু
প্রথমদিকে দৌড়াতে তিনি একেবারেই অভ্যস্ত ছিলেন না। দুই মাইলের বেশি দৌড়াতে পারতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলতে থাকেন। কয়েক মাসের মধ্যেই অংশ নেন একটি বড় দৌড় প্রতিযোগিতায় এবং তা সফলভাবে শেষ করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ দৌড়যাত্রা।
সময়ের সঙ্গে তিনি ২০টির বেশি ম্যারাথন এবং একাধিক কঠিন আল্ট্রা-ম্যারাথন সম্পন্ন করেন। এমনকি সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে দৌড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জও নেন তিনি। দৌড় তার জীবনে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, আত্মবিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতিও এনে দেয়।

ব্যক্তিগত শোক ও দৌড়ের শক্তি
রাওর্থের জীবনে একাধিক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এসেছে—প্রিয়জনের মৃত্যু, সহকর্মীর অসুস্থতা এবং মহামারির নিঃসঙ্গতা। এসব কঠিন সময়েও দৌড় তাকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রেখেছে। এমনকি কাজের প্রয়োজনে তাকে অনেক সময় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেও সংবাদ পরিবেশন করতে হয়েছে।
সহকর্মী জর্জ আলাগিয়াহর মৃত্যু সংবাদ তাকে নিজেকেই পাঠ করতে হয়েছিল, যা তার জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্ত। তবুও পেশাগত দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন তার মানসিক দৃঢ়তা।

বই লেখার অভিজ্ঞতা
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের কথা প্রকাশ করতে তিনি শুরুতে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের গল্প তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এই অভিজ্ঞতাগুলো অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
বইটিতে দৌড়ের ইতিহাস থেকে শুরু করে তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম—সবই উঠে এসেছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য বার্তা রয়েছে, বয়স কখনোই নতুন করে শুরু করার বাধা নয়।

নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা
রাওর্থ মনে করেন, মধ্য বয়স কোনো সমাপ্তি নয়, বরং নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ। তিনি বলেন, অনেক নারী নিজেকে ‘বেশি বয়সী’ ভাবেন, অথচ তারা এখনও অনেক কিছু করতে সক্ষম।
তার নিজের জীবনই তার প্রমাণ—পঞ্চাশের পরও তিনি নিজের সেরা সময় পার করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন সামলাচ্ছেন।

ক্যারিয়ারে ফিরে আসা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাওর্থ আবার তার পছন্দের জায়গায় ফিরে আসেন। তিনি এখন আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং নিজের কাজকে উপভোগ করছেন।
তার জীবনের গল্প দেখায়, ব্যর্থতা বা আঘাতই শেষ কথা নয়। সঠিক মনোভাব ও চেষ্টা থাকলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















