চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে। মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নগরী থেকে গ্রাম—সবখানেই তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে, যা জনজীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ সংকটে নগরজীবন বিপর্যস্ত
তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীতে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক এলাকায় টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি তোলা যাচ্ছে না, ফলে পানি সংকটেও পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের। অসহনীয় গরমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, যা সাধারণ গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।

বিদ্যুৎ ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াটের বেশি
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, চট্টগ্রামে বিদ্যুতের ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। যদিও কাগজে-কলমে কম দেখানো হয়, বাস্তবে ঘাটতি আরও বেশি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে বন্ধ একাধিক কেন্দ্র
জ্বালানি সংকটই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে, আর যেগুলো চালু আছে সেখানেও উৎপাদন স্বাভাবিক নয়। একইভাবে রাউজানের দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি বেসরকারি কেন্দ্রও বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।
চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ছে
একদিনের হিসাব অনুযায়ী, অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩৮৫ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে তা বেড়ে ১৪৩৩ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। কিন্তু সরবরাহ সেই অনুযায়ী না থাকায় উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

শিল্প উৎপাদনে ধস
লোডশেডিংয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্প খাতে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। শিল্প মালিকরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি
পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
নির্ধারিত বিদ্যুৎ বন্ধে ক্ষোভ
শুক্র ও শনিবার নগরীর প্রায় অর্ধেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, উন্নয়ন ও মেরামত কাজের জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আসলে লোডশেডিংকে ঢাকতেই এই ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ পরিস্থিতি
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক। এসব এলাকায় প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। প্রায় ৭ লাখ গ্রাহক এই সংকটে পড়েছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে গেছে। জ্বালানি সংকট ও কারিগরি সমস্যার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কিছু এলাকায় উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্যও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















