০৭:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যেতে না পারা কর্মীদের সহায়তায় হটলাইন চালু ইরানে হামলা ও খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকায় জামায়াতের সমাবেশ গালফ অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ঢাকায় রুমমেটকে হত্যা করে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড: রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতের প্রতি কড়া বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্যে যেতে না পারা কর্মীদের সহায়তায় হটলাইন চালু রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের আঘাত, কড়া জবাবের হুঁশিয়ারি সৌদি আরবের ট্রাম্পের বেইজিং সফর অনিশ্চিত, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রভাব বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা ইরান হামলা নিয়ে রুশ বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা: ‘এতে শুরু হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ’ ইরানে খামেনির মৃত্যুর পর নতুন দফা হামলা, কঠোর হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

রক্তাক্ত সিঁড়ি ধ্বংস স্তুপে: এ কোন মার্চ

বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে আধুনিক রাষ্ট্রপথে যাত্রার পথ পেয়েছিলো তা রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে। তারপরে বাঙালি আর কখনও পরিপূর্ণভাবে সেখানে ফিরতে পারেনি।

তারপরেও বিপুল সংখ্যক বাঙালি যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধারণ করেন, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকার, মহিয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধীর অবদান, সেক্যুলারইজম ধারণ করেন— তাদের হৃদয়েও যেমন একটি রক্তধারা ছিলো, তেমনি বঙ্গবন্ধুর রক্তধারায় ভিজে যাওয়া ৩২ নাম্বারের সিঁড়িটি তাদের চোখের সামনে ও হৃদয়ে ছিলো।

৫ আগষ্ট মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে সৃষ্ট আরবান গেরিলা ওয়ার ফেয়ারের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর— ৩২ নাম্বারের ওই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। চোখের সামনে যে রক্তাক্ত সিঁড়িটি ছিলো সেটা শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল প্রগতিশীল বাঙালির, আধুনিক বাঙালির, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের (এবারের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সামনে রেখে ভিন্ন ধরনের একটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি বানানো হয়েছে— এগুলো কৃত্রিম, এর স্থায়ী অস্তিত্ব বলে কিছু নেই) বাঙালির হৃদয়ে ওই রক্তাক্ত সিঁড়িটি থাকবে। এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সেই ওই রক্তধারায় আরো রক্তক্ষরণ বাড়বে।

যারা ওই সিঁড়ি ভেঙেছে তারা এখন এক থেকে বহু হয়ে নানানভাবে বাঙালিকে বিভ্রান্ত করছে, আরো অনেকদিন করবে। কারণ, ইতিহাসে এমন অন্ধকার মাঝে মাঝে নামে।

এই অন্ধকার শুধু প্রতিপক্ষের কারণে নামে না, নিজেদের ভুল, নিজেদের অনেক অপরাধের কারণেও এ অন্ধকার এমন জমাট বাধার সুযোগ পায়। আবার অন্ধকারের একটি বড় গুণ, অন্ধকার না নামলে নিজের ভেতর থাকা ও অন্য দিক থেকে আসা ভূত ও পিশাচ চেনা যায় না।

যদি এই অন্ধকার না নামতো তাহলে বাঙালি জানতে পারতো না বাঙালির মধ্যে এমন কুসন্তানরা জন্ম নিয়েছে যারা তাদের পরিচয়ের ঠিকানা যিনি দিয়ে গেছেন, যাদের দারিদ্র থেকে বের হয়ে আসার জন্যে একটি আলাদা দেশ দিয়ে গেছেন— তাঁর বাড়িটি এমন করে পৈশাচিক উল্লাসে ভাঙতে পারে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয়েছিল বরগুনায়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সৃষ্টি করে এই ভূখণ্ডের বাঙালিকে কী দিয়ে গেছেন, তা বাঙালি যদি একটু সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পথে প্রান্তরে ও কোলকাতার গলিতে ঘোরে তাহলে খাদ্যাভাবে অপুষ্ট শিশু ও পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত “ঘুঘনি” শিল্প দেখলেই বুঝতে পারবে।

মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে ইউনূস গত আঠারো মাসে অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির চরিত্র সৃষ্টির দিকে ধাবিত করেছে।

অনেকে মনে করছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ হয়তো ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। তাদের ধারণা সত্য হোক। বাঙালি এগিয়ে যাক। এ কামনাই করি। তবে বাস্তবতা হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন আরেকটি ফেজে পা রেখেছে। বাস্তবে এটা ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের এক্সটেনশন। এখানে অন্য যারা মনে করছে তারা বিজয়ী হয়েছে তারা কোন স্বর্গে বাস করছেন তা কিছুদিন পরে নিজেরাই বুঝতে পারবেন।

কারণ ইউনূস যা চেয়েছিল অর্থাত্‌ রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে সব বদলে দেওয়া। বাস্তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সে তার কাজে অনেকখানি সফল হয়ে— এখন নিজে পশ্চাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার রিসেট বাটনের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল নায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাদ গেছেন, বাদ গেছেন নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামন প্রমুখ, এমনকি বাদ গেছে মুজিবনগর সরকারও। বাদ গেছে সেক্যুলারইজম, বাদ গেছে বাঙালিত্ব। রবীন্দ্র— নজরুলও কতটুকু থাকবে তাও ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সাহিত্য, সমাজবোধ, সংস্কৃতিচর্চা কোন পথে যাবে তা ৫ আগষ্টের পর থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে চত্বরে দেখা যাচ্ছে।

সকালেও ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা চলছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামনের অনেকটা |  প্রথম আলো

তাই এবার মার্চ এসেছে বাঙালির জীবনে ভিন্ন এক আবহাওয়া নিয়ে। তবে এ আবহাওয়ার সঙ্গে বাঙালি যে অপরিচিত তা নয়। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পর এমন বহু মার্চ বাঙালি দেখেছে। যে রক্তাক্ত সিঁড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে ওই সিঁড়িকে বন্দী থাকতে দেখেছে। আজ যারা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি অর্থাত্‌ স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার জন্যে ওই বাড়ি, ওই রক্তাক্ত সিঁড়ি ভেঙে ফেলেছে। এদের পিতৃপুরুষরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনকে “নাজাত দিবস” পালন করেছে বহুবার এই দেশে।

তারপরেও বাঙালি তার মুক্তিসংগ্রাম, তার নেতা শেখ মুজিব, তার আধুনিকতা, তার রবীন্দ্র— নজরুলে সৃষ্ট আধুনিক মানসিকতা নিয়ে বার বার জেগে উঠেছে। জেগে ওঠার পরে আবার তাকে ৩২ নাম্বার বাড়ির মতো আগুনে পুড়তে হয়েছে। এ যেন আধুনিক বাঙালির ভাগ্যলিপি, যা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়েছে কবি শামসুর রাহমানের কণ্ঠ দিয়ে “আর কত খাণ্ডব দাহন!”

তবুও সকলের সহ-অবস্থানের বাসভূমি খাণ্ডব বনের সেই আগুনে পোড়ার লেলিহান শিখার মাঝে দাঁড়ানো ভূমির মতো এক মেটিকুলাস আগুনের মাঝে দাঁড়ানো বাংলাদেশে— এবারও কালের চক্রে আবার এসেছে বাঙালির স্বাধীনতার মাস মার্চ।

যে মার্চে বাংলাদেশের মাটি জুড়ে ছড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের টুকরোগুলো। যে মার্চে তার রক্তমাখা সিঁড়ি ধ্বংস স্তুপের একটি অংশ মাত্র।

ওই ধ্বংসস্তুপের সামনে এই মার্চে দাঁড়িয়ে বা ওই ধ্বংসস্তুপকে বুকে ধারণ করে বাংলার মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী আধুনিক মানুষগোষ্ঠী ভাবতে পারে— এই মার্চেই পঁচিশে মার্চের মতো কালো রাত এসেছিলো। এই বাংলাদেশে ১৫ আগষ্ট এসেছে। এই বাংলাদেশে ৫ আগষ্ট এসেছে।

আর প্রতিটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার জন্যে বাঙালি সন্তানরা নিজের লড়াই নিজেই করেছে। আলোর পথে যাত্রা করলে অনেক দীর্ঘ অন্ধকার পার হতে হয়। খোদ সূর্যকেও তো একটি পরিপূর্ণ চক্র শেষ করে তবে রাত থেকে দিনের আলো দিতে হয় পৃথিবীকে— মানব জীবনও তাই অন্ধকারে পড়লে একটি চক্র পূর্ণ করার সাহস ও ধৈর্য নিয়েই এগোতে হবে।

 

এবারের মার্চ যত বিষাদও অন্ধকারময় হোক না কেন, বাঙালির মার্চ আবার আলো হাতে আসবেই— কবি আল মাহমুদের ভাষায়,

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিলো যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।

১৯৭১ এর মার্চে যারা মরণ চূড়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলো, ১৯৭৫ এর পরে বাঙালিত্বর জন্যে যারা মরণ চূড়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলো— তাদের উত্তরসূরীরা শোকের বসন পরেই আবার নিয়ে আসবে উজ্জ্বল মার্চ।

কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ওই সিঁড়ির রক্তধারা ৩২ নাম্বার থেকে বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। বাস্তবে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর জুড়ে ছড়িয়ে আছে ওই রক্ত। তাই রক্ত আর শোকের বসন— এই বাঙালির চিরকালের পথ চলা।

কখনও কখনও পৃথিবীর যে কোন জাতির জীবনে বিজয়ের দিনগুলোতেও কালোরাত্রি নামে। এটা ইতিহাসের নিয়তি- তখন কোন কোন জাতিকে শোকের বসন পরতে হয়। তার রক্তধারাকে খুঁজতে হয় প্রান্তর থেকে সাগর অবধি।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে যেতে না পারা কর্মীদের সহায়তায় হটলাইন চালু

রক্তাক্ত সিঁড়ি ধ্বংস স্তুপে: এ কোন মার্চ

০৫:৫৮:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে আধুনিক রাষ্ট্রপথে যাত্রার পথ পেয়েছিলো তা রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে। তারপরে বাঙালি আর কখনও পরিপূর্ণভাবে সেখানে ফিরতে পারেনি।

তারপরেও বিপুল সংখ্যক বাঙালি যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধারণ করেন, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকার, মহিয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধীর অবদান, সেক্যুলারইজম ধারণ করেন— তাদের হৃদয়েও যেমন একটি রক্তধারা ছিলো, তেমনি বঙ্গবন্ধুর রক্তধারায় ভিজে যাওয়া ৩২ নাম্বারের সিঁড়িটি তাদের চোখের সামনে ও হৃদয়ে ছিলো।

৫ আগষ্ট মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে সৃষ্ট আরবান গেরিলা ওয়ার ফেয়ারের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর— ৩২ নাম্বারের ওই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। চোখের সামনে যে রক্তাক্ত সিঁড়িটি ছিলো সেটা শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল প্রগতিশীল বাঙালির, আধুনিক বাঙালির, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের (এবারের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সামনে রেখে ভিন্ন ধরনের একটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি বানানো হয়েছে— এগুলো কৃত্রিম, এর স্থায়ী অস্তিত্ব বলে কিছু নেই) বাঙালির হৃদয়ে ওই রক্তাক্ত সিঁড়িটি থাকবে। এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সেই ওই রক্তধারায় আরো রক্তক্ষরণ বাড়বে।

যারা ওই সিঁড়ি ভেঙেছে তারা এখন এক থেকে বহু হয়ে নানানভাবে বাঙালিকে বিভ্রান্ত করছে, আরো অনেকদিন করবে। কারণ, ইতিহাসে এমন অন্ধকার মাঝে মাঝে নামে।

এই অন্ধকার শুধু প্রতিপক্ষের কারণে নামে না, নিজেদের ভুল, নিজেদের অনেক অপরাধের কারণেও এ অন্ধকার এমন জমাট বাধার সুযোগ পায়। আবার অন্ধকারের একটি বড় গুণ, অন্ধকার না নামলে নিজের ভেতর থাকা ও অন্য দিক থেকে আসা ভূত ও পিশাচ চেনা যায় না।

যদি এই অন্ধকার না নামতো তাহলে বাঙালি জানতে পারতো না বাঙালির মধ্যে এমন কুসন্তানরা জন্ম নিয়েছে যারা তাদের পরিচয়ের ঠিকানা যিনি দিয়ে গেছেন, যাদের দারিদ্র থেকে বের হয়ে আসার জন্যে একটি আলাদা দেশ দিয়ে গেছেন— তাঁর বাড়িটি এমন করে পৈশাচিক উল্লাসে ভাঙতে পারে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয়েছিল বরগুনায়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সৃষ্টি করে এই ভূখণ্ডের বাঙালিকে কী দিয়ে গেছেন, তা বাঙালি যদি একটু সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পথে প্রান্তরে ও কোলকাতার গলিতে ঘোরে তাহলে খাদ্যাভাবে অপুষ্ট শিশু ও পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত “ঘুঘনি” শিল্প দেখলেই বুঝতে পারবে।

মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে ইউনূস গত আঠারো মাসে অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির চরিত্র সৃষ্টির দিকে ধাবিত করেছে।

অনেকে মনে করছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ হয়তো ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। তাদের ধারণা সত্য হোক। বাঙালি এগিয়ে যাক। এ কামনাই করি। তবে বাস্তবতা হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন আরেকটি ফেজে পা রেখেছে। বাস্তবে এটা ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের এক্সটেনশন। এখানে অন্য যারা মনে করছে তারা বিজয়ী হয়েছে তারা কোন স্বর্গে বাস করছেন তা কিছুদিন পরে নিজেরাই বুঝতে পারবেন।

কারণ ইউনূস যা চেয়েছিল অর্থাত্‌ রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে সব বদলে দেওয়া। বাস্তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সে তার কাজে অনেকখানি সফল হয়ে— এখন নিজে পশ্চাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার রিসেট বাটনের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল নায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাদ গেছেন, বাদ গেছেন নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামন প্রমুখ, এমনকি বাদ গেছে মুজিবনগর সরকারও। বাদ গেছে সেক্যুলারইজম, বাদ গেছে বাঙালিত্ব। রবীন্দ্র— নজরুলও কতটুকু থাকবে তাও ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সাহিত্য, সমাজবোধ, সংস্কৃতিচর্চা কোন পথে যাবে তা ৫ আগষ্টের পর থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে চত্বরে দেখা যাচ্ছে।

সকালেও ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা চলছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামনের অনেকটা |  প্রথম আলো

তাই এবার মার্চ এসেছে বাঙালির জীবনে ভিন্ন এক আবহাওয়া নিয়ে। তবে এ আবহাওয়ার সঙ্গে বাঙালি যে অপরিচিত তা নয়। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পর এমন বহু মার্চ বাঙালি দেখেছে। যে রক্তাক্ত সিঁড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে ওই সিঁড়িকে বন্দী থাকতে দেখেছে। আজ যারা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি অর্থাত্‌ স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার জন্যে ওই বাড়ি, ওই রক্তাক্ত সিঁড়ি ভেঙে ফেলেছে। এদের পিতৃপুরুষরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনকে “নাজাত দিবস” পালন করেছে বহুবার এই দেশে।

তারপরেও বাঙালি তার মুক্তিসংগ্রাম, তার নেতা শেখ মুজিব, তার আধুনিকতা, তার রবীন্দ্র— নজরুলে সৃষ্ট আধুনিক মানসিকতা নিয়ে বার বার জেগে উঠেছে। জেগে ওঠার পরে আবার তাকে ৩২ নাম্বার বাড়ির মতো আগুনে পুড়তে হয়েছে। এ যেন আধুনিক বাঙালির ভাগ্যলিপি, যা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়েছে কবি শামসুর রাহমানের কণ্ঠ দিয়ে “আর কত খাণ্ডব দাহন!”

তবুও সকলের সহ-অবস্থানের বাসভূমি খাণ্ডব বনের সেই আগুনে পোড়ার লেলিহান শিখার মাঝে দাঁড়ানো ভূমির মতো এক মেটিকুলাস আগুনের মাঝে দাঁড়ানো বাংলাদেশে— এবারও কালের চক্রে আবার এসেছে বাঙালির স্বাধীনতার মাস মার্চ।

যে মার্চে বাংলাদেশের মাটি জুড়ে ছড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের টুকরোগুলো। যে মার্চে তার রক্তমাখা সিঁড়ি ধ্বংস স্তুপের একটি অংশ মাত্র।

ওই ধ্বংসস্তুপের সামনে এই মার্চে দাঁড়িয়ে বা ওই ধ্বংসস্তুপকে বুকে ধারণ করে বাংলার মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী আধুনিক মানুষগোষ্ঠী ভাবতে পারে— এই মার্চেই পঁচিশে মার্চের মতো কালো রাত এসেছিলো। এই বাংলাদেশে ১৫ আগষ্ট এসেছে। এই বাংলাদেশে ৫ আগষ্ট এসেছে।

আর প্রতিটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার জন্যে বাঙালি সন্তানরা নিজের লড়াই নিজেই করেছে। আলোর পথে যাত্রা করলে অনেক দীর্ঘ অন্ধকার পার হতে হয়। খোদ সূর্যকেও তো একটি পরিপূর্ণ চক্র শেষ করে তবে রাত থেকে দিনের আলো দিতে হয় পৃথিবীকে— মানব জীবনও তাই অন্ধকারে পড়লে একটি চক্র পূর্ণ করার সাহস ও ধৈর্য নিয়েই এগোতে হবে।

 

এবারের মার্চ যত বিষাদও অন্ধকারময় হোক না কেন, বাঙালির মার্চ আবার আলো হাতে আসবেই— কবি আল মাহমুদের ভাষায়,

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিলো যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।

১৯৭১ এর মার্চে যারা মরণ চূড়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলো, ১৯৭৫ এর পরে বাঙালিত্বর জন্যে যারা মরণ চূড়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলো— তাদের উত্তরসূরীরা শোকের বসন পরেই আবার নিয়ে আসবে উজ্জ্বল মার্চ।

কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ওই সিঁড়ির রক্তধারা ৩২ নাম্বার থেকে বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। বাস্তবে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর জুড়ে ছড়িয়ে আছে ওই রক্ত। তাই রক্ত আর শোকের বসন— এই বাঙালির চিরকালের পথ চলা।

কখনও কখনও পৃথিবীর যে কোন জাতির জীবনে বিজয়ের দিনগুলোতেও কালোরাত্রি নামে। এটা ইতিহাসের নিয়তি- তখন কোন কোন জাতিকে শোকের বসন পরতে হয়। তার রক্তধারাকে খুঁজতে হয় প্রান্তর থেকে সাগর অবধি।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.