তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে চীন ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার পর নিউজিল্যান্ডের চারজন সংসদ সদস্যের ওপর চীনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেইজিং। চীনের অভিযোগ, ওই সফর ‘এক চীন নীতি’ লঙ্ঘন করেছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।
বৃহস্পতিবার চীনের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, মে মাসে একটি বহুদলীয় প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে চার সংসদ সদস্য তাইওয়ান সফর করেন। সেখানে তারা তাইওয়ানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হসিয়াও বি-খিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেইজিংয়ের দাবি, সফরের আগে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও প্রতিনিধিদল সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেছে।
চীনের কড়া অবস্থান
ওয়েলিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড ‘এক চীন নীতি’ লঙ্ঘন করেছে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সমতুল্য। তিনি আরও বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে যে কেউ ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করবে, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।
চীন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে স্বশাসিত তাইওয়ান তাদের ভূখণ্ডের অংশ। এ কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার বিরোধিতা করে বেইজিং।
নিউজিল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া
নিউজিল্যান্ড সরকার এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সের কার্যালয় জানিয়েছে, বহু দশক ধরেই নিউজিল্যান্ডের সংসদ সদস্যরা তাইওয়ান সফর করে আসছেন এবং এই সফর সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন, সংসদ সদস্যরা সরকার থেকে স্বাধীনভাবে বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি জানান, চীনের এই অবস্থান অতীতের চর্চা থেকে বিচ্যুত হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে এবং বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে কূটনীতিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যদিও ওয়েলিংটনের সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবুও বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী-সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। এসব কার্যক্রম নিউজিল্যান্ডের ‘এক চীন নীতি’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও তারা উল্লেখ করে।
অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংও এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ক্যানবেরা বিষয়টি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্থাপন করবে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানের যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার চীনের নেই।
বিতর্কের কেন্দ্রে সংসদ সদস্যরা
নিউজিল্যান্ডের সংসদ সদস্য সাইমন ও’কনর ও ইনগ্রিড লিয়ারি ২০২৩ সালের মার্চে তাইওয়ানবিষয়ক একটি সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ গঠন করেন। এর লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া সংসদ সদস্যদের একজন লরা ম্যাকক্লুর দেশটির গণমাধ্যমকে বলেন, চীন মূলত নিউজিল্যান্ডের আইনপ্রণেতাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের সংসদ সদস্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার তাদের রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে ক্ষমা চাইতে বলা হয়ে থাকে, তবে তাইওয়ান সফরের জন্য তিনি কোনোভাবেই ক্ষমা চাইবেন না।
একই সফরে অংশ নেওয়া আরেক সংসদ সদস্য ডানকান ওয়েব জানান, সফরের আগে চীনা দূতাবাস তাদের সতর্ক করেছিল যে তাইওয়ান গেলে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এমন প্রতিক্রিয়া হতাশাজনক হলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















