উত্তর আফ্রিকার স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতা সীমান্ত দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার অভিবাসীর প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, বর্তমান সংকটে ব্রাসেলস যে সংযত অবস্থান নিয়েছে, তা ২০২১ সালে বেলারুশ সীমান্তে অভিবাসী সংকটের সময় নেওয়া কঠোর অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
সাম্প্রতিক ঘটনায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিবাসন নীতিও ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী নেতাদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে মরক্কোর ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠলেও ইইউর শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দেশটির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনেনি।
স্পেনের ওপর চাপ বাড়াল ইউরোপের কয়েকটি দেশ
সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের পর ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে শেনজেন অঞ্চলের বাইরে রাখার দাবি তোলেন। এর পরপরই পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, সুইডেন, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিভিন্ন নেতা বা মন্ত্রীও স্পেনের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তাদের বক্তব্য, স্পেন যদি বহির্সীমান্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে পুরো শেনজেন ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিৎসো ভিন্ন অবস্থান নিয়ে বলেন, অতীতে শিথিল অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপ নিজেই সংকট তৈরি করেছে। তিনি স্পেনকে শেনজেন থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সীমান্ত নিরাপত্তায় সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।
ইইউর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন ঘটনাটিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেন এবং স্পেন ও মরক্কোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেন। তবে তিনি প্রকাশ্যে কোনো পক্ষকে দায়ী করেননি।
তার বক্তব্য ছিল, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী যাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব, তাদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে হবে এবং মরক্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহ-সভাপতি হাভি লোপেজও বলেন, অভিবাসনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে ইউরোপের উচিত পারস্পরিক সংহতির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানানো, পারস্পরিক দোষারোপ নয়।
মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্তের কিছু প্রবেশপথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্পেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব ভিডিওর ভিত্তিতে বিভিন্ন মহলে মরক্কোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২১ সালেও পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেনের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধের সময় মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল। সে সময় কয়েক হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করলে স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিযোগ করেছিল যে অভিবাসনকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে স্পেনের অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনাকে সমর্থন জানায় মাদ্রিদ।
২০২১ সালের বেলারুশ সংকটের সঙ্গে তুলনা
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২১ সালের বেলারুশ-পোল্যান্ড সীমান্ত সংকট।
সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা ঘটনাটিকে “হাইব্রিড আক্রমণ” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বেলারুশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো অভিযোগ অস্বীকার করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কঠোর অবস্থান নেয়।
এবার সেউতায় আরও বড় পরিসরে অভিবাসী প্রবেশের ঘটনা ঘটলেও মরক্কোর বিরুদ্ধে একই ধরনের ভাষা বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ কারণেই ইউরোপের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তুলনা ও সমালোচনাগুলো মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে; ইইউ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান সংকটকে ২০২১ সালের বেলারুশ ঘটনার সমতুল্য হিসেবে বর্ণনা করেনি।
বর্তমান পরিস্থিতি
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেউতায় প্রবেশকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছে। স্পেন সরকার মরক্কোকে এ সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছে।
যদিও তাৎক্ষণিক সংকট অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে, তবু এই ঘটনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সংহতি এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিস্তৃত রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















