০৪:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
বাংলাদেশকে আমেরিকা, ভারতসহ অন্যান্য দেশের গড়ে ওঠা চীনের বিকল্প সাপ্লাই চেইন জোট ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যোগ দিতে আহ্বান সার্জিও গরের চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি, ক্যাবের তীব্র প্রতিবাদ বেনজীর আহমেদ দুবাই কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত, ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা: পারিবারিক সূত্র কুষ্টিয়ার চরে সেতুহীন দুর্ভোগ: পদ্মার বালুচর পেরিয়ে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ, বিচ্ছিন্ন প্রায় এক লাখ মানুষ সুন্দরবনে ছাগল খাচ্ছে লবণপানির কুমির, পর্যটকের ক্যামেরায় বিরল ভিডিও ফরিদপুরে রেললাইনের পাশে ৮ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক ৩ প্রাথমিকের ১৪,৩৮৪ সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক প্রার্থীর অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি, আগস্টেই নিয়োগপত্রের দাবি যশোরে কলেজছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, আহত ৪ অলিখিত নিয়মের পক্ষে: কেন কখনও কখনও ‘নাক গলানো’ও নাগরিক দায়িত্ব

মার্কিন ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি: এক শতাব্দীর পুরোনো কৌশল কি নতুন রূপে ফিরে এসেছে?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন আজ আর কেবল একটি রাজনৈতিক পরিভাষা নয়; এটি গত এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের অন্যতম বিতর্কিত কৌশল। সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিরোধী গোষ্ঠীকে সহায়তা, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ—সময়ের সঙ্গে পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য একই থেকেছে: এমন সরকারকে দুর্বল বা অপসারণ করা, যারা ওয়াশিংটনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কার, শ্রমিক সংগঠনের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প জাতীয়করণের মতো নীতিকে ওয়াশিংটন সন্দেহের চোখে দেখেছে। এসব কর্মসূচিকে প্রায়ই সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও করপোরেট স্বার্থের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘ সময় এসব কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত হতো। কারণ, জাতিসংঘ সনদ এবং অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের নীতিমালা অন্য দেশের সরকারকে বলপ্রয়োগে অপসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে প্রকাশ্যে সামরিক ভাষার পরিবর্তে ব্যবহৃত হতো গোপন অভিযান, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক প্রচারণা।

কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সেই গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রক্ষণশীল নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই যুক্তি দিতে শুরু করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনে বিদেশি সরকার অপসারণ করা বৈধ কৌশল হতে পারে। ১৯৯৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে উইলিয়াম ক্রিস্টল ও রবার্ট কাগান ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের পক্ষে অবস্থান নেন এবং যুক্তি দেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।

A Conservative Vision for U.S. Foreign Policy

পরবর্তী সময়ে ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, পল উলফোভিৎজ, লুইস ‘স্কুটার’ লিবি এবং রিচার্ড পার্লের মতো নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালো করেন, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত রূপরেখা প্রত্যাখ্যানকারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপকে অস্বাভাবিক কিছু হিসেবে দেখা হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলভান্ডারের মালিক দেশটি হুগো শাভেজ এবং পরে নিকোলাস মাদুরোর আমলে স্বাধীন জ্বালানি ও পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি চীন, ভারত, কিউবা, তুরস্ক এবং সীমিত আকারে ইতালি ও স্পেনে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখে।

পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, পিট হেগসেথ এবং মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন করে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৭৬টি ভেনেজুয়েলান নৌযান ধ্বংস বা জব্দ করা হয় এবং এতে ৯৫ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, এসব অভিযানের লক্ষ্য ফেন্টানিল পাচার ঠেকানো। তবে ওই নৌযানগুলোতে ফেন্টানিল বা অন্য কোনো মাদক ছিল—এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। তা সত্ত্বেও দাবি করা হয়, প্রতিটি নৌযানে এমন পরিমাণ ফেন্টানিল ছিল, যা ২৫ হাজার মার্কিন নাগরিককে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট।

১১ ডিসেম্বর একটি ভেনেজুয়েলান তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয় এবং জানুয়ারির শুরুতে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় সাতটিতে। এরপর মাদকবিরোধী অভিযানের ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রকাশ্যে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করার ভেনেজুয়েলার প্রচেষ্টা ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোয়েম এটিকে ‘বজ্রগতির অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন এবং সতর্ক করেন যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সব প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

৩ জানুয়ারি পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় এবং মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। একই সময়ে কিউবা, পানামা, গ্রিনল্যান্ড এবং কলম্বিয়াও সম্ভাব্য পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে—এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

Iran Backs Venezuela Against Trump's 'Bullying' - Newsweek

ভেনেজুয়েলার পর দৃষ্টি ঘুরে যায় ইরানের দিকে। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সমালোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার উচ্চারিত হলেও আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করা কঠিন—ইরানের হাতে রয়েছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলের মজুত।

দক্ষিণ চীন সাগর থেকে একটি বিমানবাহী রণতরী সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়, যা ২৬ জানুয়ারি সেখানে পৌঁছায়। এর সঙ্গে ছিল একাধিক যুদ্ধজাহাজ এবং দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম। একই সময়ে বাহরাইন, সাইপ্রাস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা অবস্থান করছে। ইসরায়েলেও রয়েছে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত।

১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চায়। একই সঙ্গে জানানো হয়, অত্যন্ত শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ড্রপ সাইট নিউজকে দেওয়া এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধের মূল বিষয় কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়; লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য হবে পারমাণবিক, ব্যালিস্টিক ও সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও অকার্যকর করে দেওয়া। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দুর্বল হয়ে পড়া ইরান শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

এই ধরনের নীতি কোনো নতুন ঘটনা নয়। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে সিআইএ বিভিন্ন দেশে বিরোধী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করেছে, সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, গোপন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আশির দশকের শুরুতে নিকারাগুয়ার কনট্রাদের সহায়তা তার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ।

সরাসরি সরকার পরিবর্তনের বাইরে নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভির গবেষণা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্তত ৮১টি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে হিসাব শুরু করলে সংখ্যাটি আরও প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। তুলনামূলক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।

১৯৪৮ সালের ইতালির নির্বাচন এ ধরনের হস্তক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সে সময় বৈধ কমিউনিস্ট পার্টিকে দুর্বল করতে সিআইএ ভুয়া চিঠি ছড়ায়, প্রচারাভিযান চালায় এবং গণমাধ্যমে এমন বার্তা প্রচার করে যে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই কৌশল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

A Revolutionary's Call to Justice: Lessons from Sukarno's Indonesia  Menggugat | Global South Forum

তবে নির্বাচনী হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ছিল সামরিক অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ততা। পানামা, ইরান, গুয়াতেমালা, কঙ্গো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, বলিভিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা, গ্রেনাডা, হাইতি, লিবিয়া, ইউক্রেন এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলাসহ বহু দেশে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সরকার অপসারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, সরকারি নথি এবং ঐতিহাসিক বিতর্ক বিদ্যমান।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুকর্ণোকে সরিয়ে জেনারেল সুহার্তোর উত্থানে সিআইএ বিরোধী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন, সামরিক অংশকে প্রশিক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনা এবং বিদ্রোহীদের পরিচয় প্রকাশে সহায়তা করে। এমনকি সুকর্ণোকে বিব্রত করতে তাঁর মুখোশ ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুহার্তো সরকারের অধীনে সাত লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়।

ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তকে বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে জেনারেলদের অভ্যুত্থানে সমর্থন দেওয়া হয়। এর ফলে ২৪ বছরের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্তত এক হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী ব্যক্তিকে হত্যা বা গুম করা হয়।

চিলিতে ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থানে রিচার্ড নিক্সন, সিআইএ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সমর্থনে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতা দখল করেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে হামলার সময় আত্মহত্যা করেন। কিসিঞ্জার নিক্সনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, চিলিতে সফল একটি মার্ক্সবাদী সরকারের উদাহরণ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।

আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থানও একই যুক্তিতে সমর্থন পায়। সিআইএ সামরিক জান্তাকে গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়। পরবর্তী সময়ে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন; বহু মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়, এমনকি অনেককে বিমান থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে এসব কর্মকাণ্ড উপেক্ষিত হয়।

Smedley Butler Had an Incredible Career in the US Marine Corps | War  History Online

অবশ্য সব অভিযান সফল হয়নি। অপারেশন মঙ্গুজের অধীনে বিস্ফোরক সিগার, বিষমিশ্রিত খাবার, কলম এবং ডাইভিং স্যুটের মাধ্যমে বহুবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করা হলেও তিনি ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

আরও আগে, ১৯১৮ সালের রুশ গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান বলশেভিক বিজয় ঠেকাতে সেনা পাঠিয়েছিল। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টিকে থাকে।

১৯৩৫ সালে অবসর নেওয়ার পর মার্কিন মেরিন কর্পসের জেনারেল স্মেডলি বাটলার মন্তব্য করেছিলেন, তিনি বড় ব্যবসা ও ব্যাংকারদের জন্য ‘উচ্চমানের পেশিশক্তি’ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ‘পুঁজিবাদের গ্যাংস্টার’ ছিলেন। বহু দশক পর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে আমেরিকান মিলিটারি ইউনিভার্সিটির গোয়েন্দা অধ্যয়নের সহকারী চেয়ার ডেভিড কার্কও প্রকাশ্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শত্রুপক্ষের কাছ থেকে নিজেদের পরিকল্পনা গোপন রাখতে অস্বীকার ও প্রতারণার কৌশল ব্যবহার করবে।

তবে গত তিন দশকে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় যেসব কর্মকাণ্ড গোপনে পরিচালিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রকাশ্য সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা সরাসরি রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবু সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এখনও অনুপস্থিত। ২০২৩ সালের পর ইসরায়েল ও ইউক্রেনে কী ধরনের অস্ত্র পাঠানো হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে পেন্টাগনের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্রায়ন ম্যাকগ্যারি কেবল বলেছেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা হয় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা তাই এখনও একই প্রশ্ন সামনে আনে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং শক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়? গত এক শতাব্দীর অভিজ্ঞতা অন্তত এটুকু দেখায় যে, সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি ইতিহাসের কোনো সমাপ্ত অধ্যায় নয়; বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় এটি এখনও সক্রিয়, বিতর্কিত এবং গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশকে আমেরিকা, ভারতসহ অন্যান্য দেশের গড়ে ওঠা চীনের বিকল্প সাপ্লাই চেইন জোট ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যোগ দিতে আহ্বান সার্জিও গরের

মার্কিন ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি: এক শতাব্দীর পুরোনো কৌশল কি নতুন রূপে ফিরে এসেছে?

০৩:১১:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন আজ আর কেবল একটি রাজনৈতিক পরিভাষা নয়; এটি গত এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের অন্যতম বিতর্কিত কৌশল। সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিরোধী গোষ্ঠীকে সহায়তা, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ—সময়ের সঙ্গে পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য একই থেকেছে: এমন সরকারকে দুর্বল বা অপসারণ করা, যারা ওয়াশিংটনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কার, শ্রমিক সংগঠনের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্প্রসারণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প জাতীয়করণের মতো নীতিকে ওয়াশিংটন সন্দেহের চোখে দেখেছে। এসব কর্মসূচিকে প্রায়ই সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও করপোরেট স্বার্থের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘ সময় এসব কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত হতো। কারণ, জাতিসংঘ সনদ এবং অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের নীতিমালা অন্য দেশের সরকারকে বলপ্রয়োগে অপসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে প্রকাশ্যে সামরিক ভাষার পরিবর্তে ব্যবহৃত হতো গোপন অভিযান, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক প্রচারণা।

কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সেই গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রক্ষণশীল নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই যুক্তি দিতে শুরু করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনে বিদেশি সরকার অপসারণ করা বৈধ কৌশল হতে পারে। ১৯৯৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে উইলিয়াম ক্রিস্টল ও রবার্ট কাগান ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের পক্ষে অবস্থান নেন এবং যুক্তি দেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।

A Conservative Vision for U.S. Foreign Policy

পরবর্তী সময়ে ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, পল উলফোভিৎজ, লুইস ‘স্কুটার’ লিবি এবং রিচার্ড পার্লের মতো নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালো করেন, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত রূপরেখা প্রত্যাখ্যানকারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপকে অস্বাভাবিক কিছু হিসেবে দেখা হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলভান্ডারের মালিক দেশটি হুগো শাভেজ এবং পরে নিকোলাস মাদুরোর আমলে স্বাধীন জ্বালানি ও পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি চীন, ভারত, কিউবা, তুরস্ক এবং সীমিত আকারে ইতালি ও স্পেনে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখে।

পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, পিট হেগসেথ এবং মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন করে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৭৬টি ভেনেজুয়েলান নৌযান ধ্বংস বা জব্দ করা হয় এবং এতে ৯৫ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, এসব অভিযানের লক্ষ্য ফেন্টানিল পাচার ঠেকানো। তবে ওই নৌযানগুলোতে ফেন্টানিল বা অন্য কোনো মাদক ছিল—এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। তা সত্ত্বেও দাবি করা হয়, প্রতিটি নৌযানে এমন পরিমাণ ফেন্টানিল ছিল, যা ২৫ হাজার মার্কিন নাগরিককে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট।

১১ ডিসেম্বর একটি ভেনেজুয়েলান তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয় এবং জানুয়ারির শুরুতে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় সাতটিতে। এরপর মাদকবিরোধী অভিযানের ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রকাশ্যে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করার ভেনেজুয়েলার প্রচেষ্টা ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোয়েম এটিকে ‘বজ্রগতির অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন এবং সতর্ক করেন যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সব প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

৩ জানুয়ারি পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় এবং মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। একই সময়ে কিউবা, পানামা, গ্রিনল্যান্ড এবং কলম্বিয়াও সম্ভাব্য পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে—এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

Iran Backs Venezuela Against Trump's 'Bullying' - Newsweek

ভেনেজুয়েলার পর দৃষ্টি ঘুরে যায় ইরানের দিকে। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সমালোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার উচ্চারিত হলেও আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করা কঠিন—ইরানের হাতে রয়েছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলের মজুত।

দক্ষিণ চীন সাগর থেকে একটি বিমানবাহী রণতরী সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়, যা ২৬ জানুয়ারি সেখানে পৌঁছায়। এর সঙ্গে ছিল একাধিক যুদ্ধজাহাজ এবং দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম। একই সময়ে বাহরাইন, সাইপ্রাস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা অবস্থান করছে। ইসরায়েলেও রয়েছে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত।

১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চায়। একই সঙ্গে জানানো হয়, অত্যন্ত শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ড্রপ সাইট নিউজকে দেওয়া এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধের মূল বিষয় কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়; লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য হবে পারমাণবিক, ব্যালিস্টিক ও সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও অকার্যকর করে দেওয়া। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দুর্বল হয়ে পড়া ইরান শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

এই ধরনের নীতি কোনো নতুন ঘটনা নয়। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে সিআইএ বিভিন্ন দেশে বিরোধী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করেছে, সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, গোপন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আশির দশকের শুরুতে নিকারাগুয়ার কনট্রাদের সহায়তা তার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ।

সরাসরি সরকার পরিবর্তনের বাইরে নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভির গবেষণা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্তত ৮১টি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে হিসাব শুরু করলে সংখ্যাটি আরও প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। তুলনামূলক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।

১৯৪৮ সালের ইতালির নির্বাচন এ ধরনের হস্তক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সে সময় বৈধ কমিউনিস্ট পার্টিকে দুর্বল করতে সিআইএ ভুয়া চিঠি ছড়ায়, প্রচারাভিযান চালায় এবং গণমাধ্যমে এমন বার্তা প্রচার করে যে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই কৌশল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

A Revolutionary's Call to Justice: Lessons from Sukarno's Indonesia  Menggugat | Global South Forum

তবে নির্বাচনী হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ছিল সামরিক অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ততা। পানামা, ইরান, গুয়াতেমালা, কঙ্গো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, বলিভিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা, গ্রেনাডা, হাইতি, লিবিয়া, ইউক্রেন এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলাসহ বহু দেশে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সরকার অপসারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, সরকারি নথি এবং ঐতিহাসিক বিতর্ক বিদ্যমান।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুকর্ণোকে সরিয়ে জেনারেল সুহার্তোর উত্থানে সিআইএ বিরোধী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন, সামরিক অংশকে প্রশিক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনা এবং বিদ্রোহীদের পরিচয় প্রকাশে সহায়তা করে। এমনকি সুকর্ণোকে বিব্রত করতে তাঁর মুখোশ ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুহার্তো সরকারের অধীনে সাত লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়।

ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তকে বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে জেনারেলদের অভ্যুত্থানে সমর্থন দেওয়া হয়। এর ফলে ২৪ বছরের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্তত এক হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী ব্যক্তিকে হত্যা বা গুম করা হয়।

চিলিতে ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থানে রিচার্ড নিক্সন, সিআইএ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সমর্থনে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতা দখল করেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে হামলার সময় আত্মহত্যা করেন। কিসিঞ্জার নিক্সনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, চিলিতে সফল একটি মার্ক্সবাদী সরকারের উদাহরণ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।

আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থানও একই যুক্তিতে সমর্থন পায়। সিআইএ সামরিক জান্তাকে গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়। পরবর্তী সময়ে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন; বহু মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়, এমনকি অনেককে বিমান থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে এসব কর্মকাণ্ড উপেক্ষিত হয়।

Smedley Butler Had an Incredible Career in the US Marine Corps | War  History Online

অবশ্য সব অভিযান সফল হয়নি। অপারেশন মঙ্গুজের অধীনে বিস্ফোরক সিগার, বিষমিশ্রিত খাবার, কলম এবং ডাইভিং স্যুটের মাধ্যমে বহুবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করা হলেও তিনি ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

আরও আগে, ১৯১৮ সালের রুশ গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান বলশেভিক বিজয় ঠেকাতে সেনা পাঠিয়েছিল। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টিকে থাকে।

১৯৩৫ সালে অবসর নেওয়ার পর মার্কিন মেরিন কর্পসের জেনারেল স্মেডলি বাটলার মন্তব্য করেছিলেন, তিনি বড় ব্যবসা ও ব্যাংকারদের জন্য ‘উচ্চমানের পেশিশক্তি’ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ‘পুঁজিবাদের গ্যাংস্টার’ ছিলেন। বহু দশক পর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে আমেরিকান মিলিটারি ইউনিভার্সিটির গোয়েন্দা অধ্যয়নের সহকারী চেয়ার ডেভিড কার্কও প্রকাশ্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শত্রুপক্ষের কাছ থেকে নিজেদের পরিকল্পনা গোপন রাখতে অস্বীকার ও প্রতারণার কৌশল ব্যবহার করবে।

তবে গত তিন দশকে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় যেসব কর্মকাণ্ড গোপনে পরিচালিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রকাশ্য সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা সরাসরি রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবু সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এখনও অনুপস্থিত। ২০২৩ সালের পর ইসরায়েল ও ইউক্রেনে কী ধরনের অস্ত্র পাঠানো হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে পেন্টাগনের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্রায়ন ম্যাকগ্যারি কেবল বলেছেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা হয় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা তাই এখনও একই প্রশ্ন সামনে আনে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং শক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়? গত এক শতাব্দীর অভিজ্ঞতা অন্তত এটুকু দেখায় যে, সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি ইতিহাসের কোনো সমাপ্ত অধ্যায় নয়; বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় এটি এখনও সক্রিয়, বিতর্কিত এবং গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।