একটি সমাজকে কেবল সংবিধান, আইন বা জরিমানার ভয় দিয়ে চালানো যায় না। প্রতিদিনের সহাবস্থানকে সহজ করে তোলে আরও সূক্ষ্ম কিছু নিয়ম—যেগুলো কোথাও লেখা থাকে না, কিন্তু সবাই নীরবে মেনে চলে। লাইনে দাঁড়ানো, অন্যের সুবিধার কথা ভাবা, দোকানের পণ্য নিজের ইচ্ছেমতো বদলে না দেওয়া কিংবা নিজের তৈরি ময়লা নিজেই পরিষ্কার করা—এসব আচরণই একটি সভ্য সমাজের নীরব ভিত্তি।
সমস্যা হলো, এই অলিখিত নিয়মগুলো ভাঙার জন্য বড় কোনো অপরাধীর দরকার হয় না। বরং সাধারণ মানুষই প্রায়শই ছোট ছোট যুক্তি দাঁড় করিয়ে সেগুলো অগ্রাহ্য করে। আর আশপাশের মানুষ অস্বস্তি এড়াতে চুপ থাকলে ধীরে ধীরে ব্যতিক্রমই হয়ে ওঠে নতুন স্বাভাবিকতা।
একটি সুপারমার্কেটে এমন দৃশ্য অচেনা নয়। আগে থেকেই প্যাকেট করা আঙুরের বাক্স খুলে একজন ক্রেতা ভালো মানের থোকা বেছে অন্য বাক্সে সাজিয়ে নিচ্ছেন। আপত্তি জানানো হলে তার জবাব—তিনি তো একাধিক বাক্স কিনছেন, তাই সমস্যা কোথায়? কিংবা বাক্স সিল করা নেই, তাই ভেতরের আঙুর পরীক্ষা করা তার অধিকার।
এই যুক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় একটি বিপদ। যদি এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়, তবে ডিমের বাক্স খুলে ভালো ডিম অন্য বাক্স থেকে তুলে নেওয়াও বৈধ হয়ে যায়। সুশির ট্রে খুলে সবচেয়ে তাজা টুকরো নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়ারও বাধা থাকে না। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে যদি নিজের সুবিধামতো নিয়মের অর্থ নির্ধারণ করতে শুরু করে, তাহলে আর কোনো নিয়মই কার্যকর থাকে না।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-514165406-590affa25f9b5864701becf9-5c3e44dfc9e77c0001914221.jpg)
এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকেই মুখ খোলেন না। কারণ অপরিচিত কাউকে সংশোধন করতে যাওয়া অস্বস্তিকর। কেউ তর্কে জড়াতে চান না, কেউ ভাবেন এতে কী-ই বা পরিবর্তন হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সবাই যদি একইভাবে নীরব থাকে, তাহলে ভুল আচরণকে ভুল বলবে কে?
সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বড় অংশটাই নির্ভর করে সাধারণ মানুষের এই ক্ষুদ্র প্রতিক্রিয়াগুলোর ওপর। কারণ পুলিশ প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি পার্কে কিংবা প্রতিটি আবাসিক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। অনেক নিয়ম কেবল মানুষের পারস্পরিক প্রত্যাশা ও সামাজিক চাপের কারণেই টিকে থাকে।
অবশ্য এখানেই আরেকটি দ্বিধাও তৈরি হয়। অন্যকে বারবার সংশোধন করতে গেলে মানুষ সহজেই ‘নাক গলানো’ বা ‘সবজান্তা’ তকমা পেয়ে যায়। কেউই এমন সমাজ চান না, যেখানে স্বঘোষিত নীতিপুলিশেরা প্রতিটি আচরণের বিচারক হয়ে ওঠে। কিন্তু তার উল্টো দিকটিও সমান উদ্বেগজনক—এমন এক সমাজ, যেখানে সবাই ভুল দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয়, কারণ প্রতিবাদ করাটা অস্বস্তিকর।
এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন।
ধরা যাক, একটি আবাসিক এলাকায় পুনর্ব্যবহারের জন্য কার্ডবোর্ড সংগ্রহের খাঁচা রাখা হয়েছে। মানুষ উৎসাহ নিয়ে পুরোনো বাক্স এনে রাখছেন। কিন্তু বেশিরভাগই বাক্সগুলো ভাঁজ করছেন না, প্লাস্টিকের মোড়ক ও টেপও খুলছেন না। ফলে পরে স্বেচ্ছাসেবক বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
এখানে একটি যুক্তি হলো, অন্তত মানুষ পুনর্ব্যবহার তো করছেন। তাদের সদিচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্য যুক্তিটি বলছে, সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অসমাপ্ত কাজের বোঝা তো শেষ পর্যন্ত অন্য কারও কাঁধেই পড়ছে। কেবল ভালো ইচ্ছা দিয়ে কার্ডবোর্ড ভাঁজ হয় না।
এই বিতর্কের ভেতরে সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আমরা কি মানুষের সামান্য উদ্যোগকেই যথেষ্ট ধরে নেব, নাকি তাদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করব?

অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন মানুষের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত ছাড়ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। তাই সহমর্মিতা ও জবাবদিহির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই জরুরি।
একই বিষয় দেখা যায় জনপরিসরের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও। কেউ নিজের পোষা প্রাণীর মল রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান। প্রতিবেশী আপত্তি করলে উত্তর আসে, এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে জনপরিসরে কোনো আচরণই পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। যে রাস্তা, যে ফুটপাত, যে পার্ক সবাই ব্যবহার করে, সেখানে একজনের অবহেলার মূল্য অন্য সবাইকে দিতে হয়।
আধুনিক নগরজীবন মূলত অসংখ্য ক্ষুদ্র আত্মসংযমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা লাইনে দাঁড়াই, উচ্চস্বরে কথা বলা এড়াই, ব্যবহারের পর ট্রলি যথাস্থানে ফিরিয়ে রাখি, দোকানের প্যাকেট খুলে নিজের সুবিধামতো পণ্য বদলাই না। এসব নিয়মের বেশিরভাগই আইনের বইয়ে লেখা নেই। এগুলো টিকে আছে কারণ অধিকাংশ মানুষ স্বেচ্ছায় সেগুলো মেনে চলেন।
কিন্তু যখন মানুষ নিজের সুবিধার জন্য ব্যতিক্রমের ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে শুরু করে, তখন সেই অদৃশ্য সামাজিক চুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। “এতেই বা ক্ষতি কী”, “আগেই তো নোংরা ছিল”, “আমি কর দিই, তাই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই করবে”—এ ধরনের যুক্তি শুনতে নিরীহ মনে হলেও, এগুলো ধীরে ধীরে সম্মিলিত দায়িত্ববোধকে ক্ষয় করে।
সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি তাই আইন প্রয়োগে নয়, বরং নাগরিকদের পারস্পরিক সম্মানবোধে। ভুল দেখলে সব সময় চুপ থাকা যেমন দায়িত্বশীল নাগরিকের লক্ষণ নয়, তেমনি প্রতিটি বিষয়ে কঠোর বিচারক হয়ে ওঠাও কাম্য নয়। প্রয়োজন এমন এক নাগরিক মানসিকতা, যেখানে মানুষ অন্যের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেও সামাজিক নিয়মের পক্ষে দাঁড়াতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি শহরের মান নির্ধারণ করে তার সুউচ্চ ভবন নয়, বরং সেই শহরের মানুষ প্রতিদিন কতবার নিজের ছোট্ট সুবিধার চেয়ে সবার স্বার্থকে বড় করে দেখতে পারেন।
তান ডন উই 


















