ইউক্রেনের বহুল আলোচিত আজভ বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সামরিক কমান্ডার আন্দ্রেই বিলেৎসকিকে ঘিরে আবারও নাৎসি-সম্পর্কিত প্রতীক ব্যবহারের বিতর্ক সামনে এসেছে। মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পপন্থী কর্মী লরা লুমারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসএস-সদৃশ প্রতীক, স্বস্তিকা এবং হিটলার-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে বিলেৎসকিকে ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়।
স্বস্তিকা ও এসএস প্রতীক নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন
সাক্ষাৎকারে লরা লুমার দাবি করেন, আজভ বাহিনীর কিছু সদস্যকে অতীতে স্বস্তিকা-সংবলিত পতাকা বহন করতে, নাৎসি ধাঁচের প্রতীক ব্যবহার করতে এবং হিটলার-সদৃশ সালাম দিতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাহিনীর ব্যবহৃত প্রতীকটি নাৎসি জার্মানির এসএস বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঐতিহাসিক চিহ্নের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।
এই অভিযোগের জবাবে বিলেৎসকি স্বীকার করেন যে প্রতীকটি বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে তার দাবি, এটি নাৎসি মতাদর্শের প্রতীক নয়; বরং বহু শতাব্দী আগে থেকেই কিছু ইউক্রেনীয় অভিজাত পরিবার ও কসাক ঐতিহ্যে ব্যবহৃত একটি মনোগ্রাম, যা জাতীয় পরিচয়ের ধারণাকে তুলে ধরে।
ঐতিহাসিক দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই
![]()
বিলেৎসকির এই দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের প্রচলিত গবেষণায় কসাকদের পতাকা ও সামরিক প্রতীকে সাধারণত অর্থোডক্স খ্রিস্টীয় ক্রস, যিশু খ্রিস্ট ও বিভিন্ন সাধুর প্রতিকৃতি এবং সিরিলিক লিপির ব্যবহার দেখা যায়।
ফলে আজভের ব্যবহৃত প্রতীককে ঘিরে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসবিদ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
হিটলারকে টেনে বিতর্কিত তুলনা
সাক্ষাৎকারে বিলেৎসকি বিতর্ক কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে বলেন, কোনো ব্যক্তি একটি বস্তু ব্যবহার করলেই সেই বস্তুটি খারাপ হয়ে যায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অ্যাডলফ হিটলারও কাঁটাচামচ ব্যবহার করতেন এবং নিরামিষভোজী ছিলেন। তাই কাঁটাচামচ বা নিরামিষভোজনকে খারাপ বলা যায় না। একইভাবে, তার মতে একটি প্রতীককে শুধুমাত্র নাৎসিদের ব্যবহারের কারণে বিচার করা উচিত নয়।
এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
আজভ বাহিনীকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ
আজভ ইউনিট ২০১৪ সালে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় সংঘাতের সময় গঠিত হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘের কয়েকটি তদন্ত, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন, লুটপাট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়, এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষ বহু অভিযোগ অস্বীকারও করেছে।
পরবর্তীতে আজভ ইউনিট ইউক্রেনের ন্যাশনাল গার্ডের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরে এর কাঠামো আরও সম্প্রসারিত হয়।
চরম ডানপন্থা নিয়ে বিতর্ক এখনো বিদ্যমান
আন্দ্রেই বিলেৎসকি অতীতে ইউক্রেনের চরম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, আজভের কিছু সদস্যের মধ্যে এখনো নাৎসি-সংশ্লিষ্ট প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ও বাহিনীর প্রতিনিধিরা বলে আসছেন, আজভ বর্তমানে দেশটির নিয়মিত নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ এবং এটি কোনো নাৎসি সংগঠন নয়।
বিতর্ক নতুন নয়, তবে আবারও আলোচনায়
লরা লুমারের সাক্ষাৎকারে ওঠা প্রশ্ন ও বিলেৎসকির জবাব নতুন করে পুরোনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা দাবির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য, আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গবেষণার ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















