আর্মেনিয়ায় আগামী ৭ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পার্লামেন্ট নির্বাচন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য ও নতুন বাণিজ্যপথের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো গভীরভাবে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে।
এই আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি (টিআরআইপিপি) নামে পরিচিত একটি বাণিজ্য করিডোর। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এই রুট আর্মেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আজারবাইজানকে তার নাখচিভান ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করবে। সেখান থেকে তুরস্কের কার্স হয়ে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। সমর্থকদের মতে, এটি ইউরেশীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্কে আর্মেনিয়ার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়াতে পারে।
নির্বাচনে এগিয়ে পাসিনিয়ান
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাসিনিয়ানের নেতৃত্বাধীন সিভিল কনট্রাক্ট পার্টি রাশিয়াপন্থী দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এই দলটি পুনর্নির্বাচনের সম্ভাব্য সুবিধা ভোগ করছে।
তবে জরিপে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন বা নিজেদের অবস্থান প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকায় নির্বাচনের ফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাসিনিয়ানবিরোধী বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগও সামনে এসেছে।
শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এই নির্বাচন আর্মেনিয়া-আজারবাইজান শান্তি প্রক্রিয়ার একটি বড় পরীক্ষা। ২০২৪ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি এবং টিআরআইপিপি সহযোগিতা কাঠামো নিয়ে অগ্রগতি হয়েছিল।
দীর্ঘদিন নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাত এবং তুরস্কের সঙ্গে বন্ধ সীমান্তের কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্য থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল আর্মেনিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্কের কিছুটা উষ্ণতা দেখা গেছে।
তবুও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা রয়ে গেছে। আজারবাইজান দাবি করছে, আর্মেনিয়ার সংবিধানে এখনো নাগোর্নো-কারাবাখ প্রশ্ন পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে চূড়ান্ত চুক্তির আগে সাংবিধানিক পরিবর্তন চায় বাকু। তবে এমন পরিবর্তনের জন্য সংসদীয় সুপারমেজরিটি ও গণভোট প্রয়োজন হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
২০২৩ সালে আজারবাইজান নাগোর্নো-কারাবাখের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় রুশ শান্তিরক্ষীরা কার্যকর ভূমিকা না নেওয়ায় মস্কোর প্রতি আর্মেনিয়ার আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে।
অন্যদিকে আর্মেনিয়ার ইউরোপমুখী কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও রাশিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মস্কোর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাশিয়া-সমর্থিত ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সদস্যপদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, আর্মেনিয়ার অর্থনীতি এখনো রাশিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর হাজার হাজার রুশ নাগরিক আর্মেনিয়ায় চলে আসে এবং দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে আর্মেনিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজর
নির্বাচনকে ঘিরে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াই নয়, ভারত, চীন, ইরান এবং তুরস্কও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। ভারত আর্মেনিয়ার অন্যতম বড় অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইয়েরেভান। অন্যদিকে ইরান আশঙ্কা করছে, নতুন করিডোর তার আঞ্চলিক বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন একাই আর্মেনিয়াকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করবে না। তবে এটি নির্ধারণ করতে পারে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি ও সংযোগভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো টিকে থাকবে কি না। দক্ষিণ ককেশাসকে সংঘাতের অঞ্চল থেকে সংযোগ ও সহযোগিতার অঞ্চলে রূপান্তরের সম্ভাবনাও অনেকাংশে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















