পর্দার আড়ালে এক নতুন অপরাধ সাম্রাজ্যের উত্থান
অপরাধের জগৎ বদলে গেছে। একসময় অপরাধচক্রের সদস্য হতে হতো পরিচয়ের মাধ্যমে, দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করতে হতো আস্থার সম্পর্ক। এখন সেই প্রয়োজন নেই। একটি স্মার্টফোন, একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এবং কিছু অর্থের লোভ—এই তিনটিই যথেষ্ট। কয়েকটি বার্তা, কিছু নির্দেশনা আর গোপন যোগাযোগের মধ্য দিয়েই একজন কিশোরকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এমন এক অন্ধকার জগতে, যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।
ইউরোপজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক ভয়াবহ বাস্তবতা। সুইডেনভিত্তিক কুখ্যাত ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের খুঁজে বের করছে এবং তাদের দিয়ে হত্যা, বিস্ফোরণ ও সহিংস হামলার মতো অপরাধ সংঘটিত করাচ্ছে। তদন্তকারীদের ভাষায়, এটি শুধু একটি অপরাধচক্র নয়; বরং এটি অপরাধ পরিচালনার এক নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মডেল।
ভিডিও গেমের মতো সাজানো হয় হত্যার নির্দেশনা
ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপলের অধীনে গঠিত অপারেশনাল টাস্কফোর্স গ্রিম জানিয়েছে, এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—তারা কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর পুরো প্রক্রিয়াটিকে ভিডিও গেমের মতো করে সাজায়।

প্রথমে ছোট একটি কাজ। এরপর আরও বড় দায়িত্ব। ধাপে ধাপে নতুন ‘মিশন’। প্রতিটি কাজ শেষ হলে আসে পরবর্তী নির্দেশনা। এইভাবে একজন কিশোর বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে পড়ে সংঘবদ্ধ অপরাধের জালে। শেষ পর্যন্ত তার হাতেই তুলে দেওয়া হয় আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক কিংবা হত্যার দায়িত্ব।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই কৌশল তরুণদের মানসিক দুর্বলতা, কৌতূহল এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষাকে লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে।
‘হত্যার দায় আউটসোর্স’ করছে অপরাধচক্র
ইউরোপলের ইউরোপীয় গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধ কেন্দ্রের প্রধান অ্যান্ডি ক্রাগ এই প্রবণতাকে বর্ণনা করেছেন ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যার দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া’ হিসেবে।
তার মতে, অপরাধচক্রের মূল পরিকল্পনাকারীরা নিজেরা কখনোই ঘটনাস্থলে যায় না। তারা নিরাপদ দূরত্বে বসে অনলাইনের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়। আর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সহজে প্রভাবিত হওয়া কিশোররা।
এর ফলে অপরাধের নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং আইনগত ঝুঁকির বড় অংশ বহন করতে হয় অল্পবয়সীদেরই।
ইউরোপের ১১ দেশ একসঙ্গে মাঠে
এই নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় ইউরোপের ১১টি দেশ যৌথভাবে কাজ করছে। বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য বর্তমানে অপারেশনাল টাস্কফোর্স গ্রিমের আওতায় তথ্য বিনিময়, গোয়েন্দা নজরদারি এবং যৌথ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের লক্ষ্য শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা নয়; বরং কিশোরদের অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ার আগেই সেই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।

রহস্যে ঘেরা ফক্সট্রটের নেতা
তদন্তে উঠে এসেছে, ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতা রাওয়া মাজিদ দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের অন্যতম পলাতক অপরাধী হিসেবে পরিচিত।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি সুইডেন ছেড়ে প্রথমে তুরস্কে অবস্থান করেন। পরে তার কার্যক্রমের কেন্দ্র ইরানের রাজধানী তেহরানে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
যদিও তিনি এসব অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি, তবু ইউরোপের একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের ওপর নিবিড় নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
তদন্তকারীদের দাবি, ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের কিছু হামলা ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে।
এর মধ্যে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ইসরায়েলি দূতাবাসে গ্রেনেড হামলার ঘটনাও রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। একই সময়ে মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরেও প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধচক্রগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি এবং বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত এখনো চলমান।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকের তিন বছরের অনুসন্ধান
সুইডিশ সম্প্রচারমাধ্যম এসভিটির অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহু গত তিন বছর ধরে ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের কার্যক্রম অনুসন্ধান করছেন।
তার দাবি, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী ব্যক্তি, সরকারবিরোধী কর্মী, সাংবাদিক এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে এই নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

এই দাবিগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
কেন টার্গেট কিশোররা?
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের ব্যবহার করার পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত কৌশল। অল্পবয়সীরা দ্রুত অর্থের প্রলোভনে পা দেয়, অনেকেই ঝুঁকির পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে না, আবার অনেকের মধ্যে থাকে রোমাঞ্চের আকর্ষণ।
অপরাধচক্রগুলো ঠিক এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। তারা এমনভাবে সম্পর্ক তৈরি করে, যেন অপরাধ নয়, বরং একটি খেলা বা চ্যালেঞ্জে অংশ নিচ্ছে তরুণরা।
ফলে একটি পুরো প্রজন্মকে ধীরে ধীরে সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপের জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক সংকটও
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং পুরো সমাজের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা।
কারণ, অপরাধীরা এখন আর শুধু রাস্তায় নয়—তারা পৌঁছে যাচ্ছে কিশোরদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় এবং ডিজিটাল জীবনের ভেতরে।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি অনলাইনে কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন ইউরোপের অন্যতম বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















